সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

হিন্দুধর্মের স্থিতি - মহাত্মা গান্ধী

নিজস্ব প্রতিবেদক : ॐ তত্ত্বদর্শী~TatwaDarshi~तत्त्वदर्शी ॐ










হিন্দুধর্মের স্থিতি - মহাত্মা গান্ধী 
_________________________

হিন্দুরা এক প্রাণময় সত্তা। তার বৃদ্ধি ও ক্ষয় আছে। তা প্রকৃতির নিয়মের বশীভূত । মূলে তা ছিল এক এবং অবিভাজ্য, কালে তা এক বিশাল মহীরুহ, অসংখ্য ডালপালা তার। ঋতুর পরিবর্তন তাকে প্রভাবিত করে। তার শরৎ, গ্রীষ্ম, শীত ও বসন্ত আছে। বৃষ্টি তাকে পুষ্টি যোগায়, তাকে ফলন্ত করে। ধর্মগ্রন্থে এর ভিত্তি আছে, আবার নেইও। কোন একটি গ্রন্থ থেকে এ পথনির্দেশ নেয় নি। গীতা সার্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছে। তবু, তা পথ দেখায় মাত্র। আচরিত প্রথার উপর এর কোন প্রভাব নেই। গঙ্গার মতই, হিন্দুত্ব উৎসে শুদ্ধ ও দূষণহীন। তবে প্রবাহপথে সে বয়ে নিয়ে চলে অনেক দূষণ। গঙ্গার মতই এর সমগ্র প্রভাবটি উপকারী। প্রতি প্রদেশে এ সেখানকার প্রাদেশিক রূপ নয় । তবে সর্বত্র অটুট থাকে এর আন্তরশক্তি। আচরণ বা প্রথা ধর্ম নয় । প্রথা বদলায়, কিন্তু ধর্ম বদলাবে না ।

এর প্রবক্তাদের আত্মসংযমের ওপরেই হিন্দুত্বের শুদ্ধতা নির্ভর করে। যখনি ধর্ম বিপন্ন হয়েছে, হিন্দুরা কঠোর প্রায়শ্চিত্ত করেছে, বিপদের কারণ অনুসন্ধান করেছে। তার সঙ্গে লড়বার উপায় উদ্ভাবন করেছে। শাস্ত্রগুলি বেড়েই চলেছে। বেদ, উপনিষদ, স্মৃতি, পুরাণ ও ইতিহাস-এর সূচনা একই সময়ে হয়নি। বিশেষ সময়ের প্রয়োজন থেকে একেকটির উদ্ভব। তাই মনে হয়, এদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। এ সব গ্রন্থ চিরন্তনী সত্যকে নতুন করে ঘোষণা করে না। তবে যে যুগে রচিত, সে সময়ে এ সব প্রথা কীভাবে আচরিত হত, তা জানিয়ে দেয়। এক বিশেষ যুগের পক্ষে এক আচরণবিধি হয়তো উপযোগী ছিল। অন্য যুগে তার অন্ধ পুনরাবৃত্তি মানুষকে হতাশার পক্ষে নিমজ্জিত করবে। একসময়ে পশুবলি দেওয়া হত। আমরা কি আবার তা ফিরিয়ে আনব? এক সময়ে আমরা চোরদের হাত-পা কেটে ফেলতাম। সেই বর্বরতা কি আজ আবার শুরু করব? মেয়েদের বহুস্বামীকে বিবাহ প্রথা, বাল্য-বিবাহ আবার ফিরিয়ে আনব? একদা মানবতার এক অংশকে বর্জন করেছিলাম, আজ তাদের বংশধরদের কি জাতিচ্যুত বলব?

হিন্দুত্ব বদ্ধাবস্থাকে ঘৃণা করে। জ্ঞান সীমাহীন, সত্যের প্রয়োগও সীমাহীন। আত্মার শক্তিকে প্রত্যহ যোগ করি আমাদের জ্ঞানের সঙ্গে। এ কাজ আমরা করে চলব। নতুন অভিজ্ঞতা আমাদের শেখাবে নতুন কর্তব্য। তবে সত্য চিরকাল অপরিবর্তিত থাকবে। বেদ সত্যকে প্রতিভাত করে, বেদ সীমাহীন। কিন্তু বেদকে সম্পূর্ণ জানে কে? আজ বেদ নামে যা চলে, তা সেই জ্ঞান ভাণ্ডার, সেই প্রকৃত বেদের এক অণু অংশও নয়। যে কয়টি গ্রন্থ আছে, তার সম্পূর্ণ অর্থ জানে কে? এমন সব অন্তহীন জটিলতার মধ্য দিয়ে চলার চেয়ে অনেক ভাল শিক্ষা দিয়েছেন জ্ঞানীরা। একটি জিনিসই শিখতে বলেছেন, “আত্মাবিষয়ে যেমন, বিশ্ববিষয়েও তেমন।' বিশ্বকে তো পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ সম্ভব নয়, আত্মা বিশ্লেষণ সম্ভব। নিজেকে জানো, বিশ্বকে জানতে পারবে। তবু অন্তরস্থিত আত্মজ্ঞান মানে আগেই মেনে নেওয়া যে, অক্লান্ত চেষ্টা চালাতে হবে। শুধু অক্লান্তই নয়, তাকে শুদ্ধও হতে হবে। শুদ্ধ পরিশ্রম মানে এক শুদ্ধ হৃদয়, যা ইয়ম * এবং নিয়মের অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। যাকে বলা চলে চারটি গুণ, এবং অভাবিতপূর্ব গুণের সমন্বয় ।

ঈশ্বরের করুণা মানেই বিশ্বাস ও ভক্তি, আর তাঁর করুণা ব্যতীত এ অনুশীলন সম্ভব নয়। তাই তুলসীদাস রামনামের মহিমা গেয়েছেন, ভাগবতের গ্রন্থকার শিখিয়েছেন দ্বাদশাক্ষর মন্ত্র (ওম নমো ভগবতে বাসুদেবায়)। এ মন্ত্র যিনি অন্তর থেকে উচ্চারণ করতে পারেন, আমার মতে তিনি এক সনাতনী হিন্দু। আর সবই এক অতলান্ত খাদ, জ্ঞানী আখো যেমন বলেছেন ।

ইয়ম, যোগশাস্ত্র মতে শ্রেষ্ঠ গুণ হল, অহিংস (হিংসা নয়), সত্য, অন্তেয় (চুরি না করা), ব্রহ্মচর্য (চিরকৌমার্য), অপরিগ্রহ (সম্পত্তি না-থাকা), নিয়ম, অথবা গৌণ হল যোগশাস্ত্র মতে শৌচ (দেহের শুচিতা), সন্তোষ (সর্বাস্থায় তৃপ্তি), তপ (তপস্যা), স্বধ্যায়ন (ধর্মগ্রন্থ অনুশীলন), ঈশ্বরবিধান (ঈশ্বরেচ্ছায় কাছে আত্মসমর্পণ) ইউরোপীয়রা আমাদের আচরণ ও প্রথা চর্চা করে। তবে সে তো ভক্তজনের চর্চা নয়, সমালোচকের চর্চা। তাদের 'চর্চা' আমাকে ধর্ম শেখাতে পারে না। হিন্দুত্ব মানে আহারে বাছবিচার নয়। ন্যায্য আচরণ, সত্যের সঠিক অনুধাবন এবং অহিংসা হল হিন্দুত্বের সারনির্যাস। অনেক মানুষ হয়তো মাংসাহারী। কিন্তু তার আছে ঈশ্বরভীতি, সহানুভূতি ও সত্য—এ সব শ্রেষ্ঠ গুণ সে মেনে চলে। যে কপট ব্যক্তি মাংস খায় না, তার চেয়ে হিন্দু হিসেবে এ ভালো । যে গোমাংস বা অন্য মাংস ভক্ষণের মধ্যে সত্যই যে হিংসা আছে, সে বিষয়ে অবহিত এবং সে জন্য আমিষ ত্যাগ করেছে, – যে 'মানুষ, পশু ও পাখিকে ভালবাসে, সে আমাদের পূজা পাবার যোগ্য। সে ঈশ্বরকে দেখেছে, জেনেছে । সে তাঁর শ্রেষ্ঠ উপাসক। সে মানবতার শিক্ষক।

হিন্দুত্ব এবং অন্য সকল ধর্ম তুলাদণ্ডে ওজন করা হচ্ছে। চিরন্তন সত্য এক। ঈশ্বরও এক। এসো, আমরা সবাই পরস্পরবিরোধী ধর্মমত ও প্রথা থেকে দূরে থাকি । সত্যের সিধা পথে চলি। একমাত্র তখনি আমরা প্রকৃত হিন্দু হব। অনেকে আছে, যারা নিজেদের বলছে সনাতনী । ঈশ্বর তাদের কত সামান্য ক'জনকে বেছে নেবেন, তা কে জানে? যারা তাঁর ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে, তাঁর দ্বারে অপেক্ষায় থাকে, ঈশ্বরের করুণা বর্ষিত হবে তাদের ওপর। যারা শুধু মুখে ‘রাম রাম’ বলে, তাদের ওপর নয়।

(ইয়ং ইণ্ডিয়া, ৮ এপ্রিল ১৯২৬/

© হিন্দুধর্ম ও সমাজ - মহাত্মা গান্ধী

#তত্ত্বদর্শী #tatwadarshi‌‌ #Tatwadarshi #ত_ধ_গ #तत्त्वदर्शी

মন্তব্যসমূহ