সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দেহরথে জগন্নাথ ও শ্রীক্ষেত্র - পঞ্চানন ভট্টাচার্য

নিজস্ব প্রতিবেদক : ॐ তত্ত্বদর্শী~TatwaDarshi~तत्त्वदर्शी ॐ




ছবি: নেট থেকে সংগৃহীত 

১. জগন্নাথ ও শ্রীক্ষেত্র                                               
২. প্রকৃত সম্পতি কি?                                                
৩. সাকার নিরাকার বাদ ও বাহ্যপূজা                         


আমি রাসোৎসবটিকে না হয় পরে দেখিব, প্রথমে শ্রীক্ষেত্রের জগন্নাথ দেবকেই দেখিয়া | লই, জগন্নাথ দেবকে দেখিতে যাওয়াই কষ্টকর। কষ্টকর হইবার কারণ, জগন্নাথ দেবের যাহা শ্রীমন্দির আছে, তাহা দর্শন করা বড়ই দূরূহ। মাতা পুত্রে উভয়ে একত্রে মন্দির দর্শন করিলে উভয়কেই নতশির হইতে হয়। জিজ্ঞাসা করিলে যাঁহারা বৈষ্ণব তাঁহারা বলিয়া থাকেন “এখানে বৈষ্ণবী চক্র বর্ত্তমান, এখানে কোন প্রকার অন্নাদি প্রভৃতির বিচার নাই”। আবার যাঁহারা তান্ত্রিক, তাঁহারা বলিয়া থাকেন “ইহা ভৈরবীচক্র জগন্নাথ ভৈরব বর্তমান, সুতরাং এখানে কোন রকম পান ভোজন প্রভৃতির কোন জাতি বিচার নাই।” এই ভৈরবী চক্রে বা বৈষ্ণবী চক্রে যে কোন জাতিই হউক না কেন আগমন মাত্রই দ্বিজোত্তম হইয়া থাকে। শ্রীমন্দিরের উপরিস্থিত কদৰ্য্য চিত্রাদি সন্বন্ধে যাহা তাঁহারা বলিয়া থাকেন, তাহাও ভয়ানক, উহা লিখিয়া আমার হস্ত কলুষিত করিবার প্রয়োজন নাই। মোট কথা, বৈষ্ণবী চক্রে বা ভৈরবী চক্রে কোন প্রকার বিচার করা নিষিদ্ধ। জগন্নাথ দেবও আমার ন্যায় জীবের বিচার আচার দেখিয়া ঘৃণা ও লজ্জায় যেন নিজের উদর মধ্যে নিজের হস্তপদাদি সঙ্কুচিত করতঃ কাষ্ঠপুত্তলিকা হইয়া বসিয়া আছেন। বস্তুতঃ কাষ্ঠপুত্তলিকা জগন্নাথ দেব নহেন ইহাতেও বেদাভাসের চিত্র বিচিত্র রহিয়াছে। জগন্নাথ দেবকে অনেকে দারুব্রহ্ম বলিয়া থাকেন। বেদই ব্রহ্ম, ঐ বেদ চারি প্রকার ঋক্, যজু, সাম ও অথর্ব্ব। ইহার মধ্যে যজুর্ব্বেদ প্রথম। এই যজুর্ব্বেদ দুই শাখায় বিভক্ত, শুক্লযজু ও কৃষ্ণযজ্ঞ। এই যজুর্ব্বেদ যুক্তবেদ বিশেষ। এক্ষণে দারুব্রহ্ম কোথায় রহিয়াছেন, তাহাই দেখা যাউক। শ্রীশব্দের অর্থ কি? শ্রীশব্দে তিনটি বর্ণ রহিয়াছে শ, র, ঈ। শ অর্থে শিব অর্থাৎ প্রাণ, (যে রুদ্রাস্তে খলুপ্রাণাঃ) যিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করিতেছেন, র অর্থে বহ্নি- বীজ, যাহা জীবের চক্ষে প্রকাশ, ঈ অর্থে শক্তি সুতরাং প্রাণবায়ুকে শক্তি দ্বারায় চক্ষে স্থির করিলে যে অবস্থা হয়, তাহারই নাম শ্রী! কিংবা সর্বলোকে যাহাকে সেবা করে, তাহাকেও শ্রী বলা যাইতে পারে। এক্ষণে সর্বলোক কাহার সেবা করে, তাহাই দেখা যাউক। যদি বলা যায়, সর্বলোক দারু মূর্ত্তি জগন্নাথ দেবকেই সেবা করিয়া থাকে, তাহাতেই বা আপত্তি কি হইতে পারে। আপত্তি যে একবোরেই হইতে পারে না, তাহা নহে। কারণ দারু মূর্ত্তি জগন্নাথ দেবকে এক হিন্দু ব্যতীত বৌদ্ধ, জৈন, মুসলমান, খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীগণ কেহই ত' সেবা করেন না। সুতরাং এমতস্থলে সর্বলোক হইল কোথায়? ইহাতে এক হিন্দু ভিন্ন আর সকলকারই আপত্তি হইতে পারে। কিন্তু যদি বলি সম্পত্তির সেবা সকলেই করিয়া থাকে সুতরাং সম্পত্তি শ্রীপদবাচ্য তাহাতে আর কাহারও আপত্তি হইবার সম্ভাবনা দেখিতেছি না। কারণ সম্পত্তি চাহে না কে তাহাও দেখিতে পাই না। হিন্দুই হউন আর বৌদ্ধই হউন, মুসলমানই হউন বা খ্রীষ্টানই হউন সম্পত্তি প্রাপ্তির ইচ্ছা সকলেরই আছে, এবং সম্পত্তির সেবা সকলেই করিয়া থাকেন। এখানে সম্পত্তি কাহাকে বলে তাহাই দেখি। সাধারণতঃ ধন রত্ন টাকা কড়ি ইত্যাদিকেই আমার সম্পত্তি বলিয়া জ্ঞান আছে, কারণ ধন রত্নাদি দ্বারা আমার অভাব মোচন হইয়া থাকে। যাহার দ্বারা অভাব মোচন হয় তাহাই সম্পত্তি পদবাচ্য। এক্ষণে ধন রত্নাদি দ্বারা প্রকৃত অভাব মোচন হয় কিনা তাহাই আমার বিবেচ্য। একটু বিবেচনা করিয়া দেখিলেই বুঝতে পারা যায় যে ধন রত্নাদি দ্বারা আমার অভাব মোচন হয় না, কারণ ধনরত্ন টাকা কড়ি প্রাপ্তির ইচ্ছার যে নাশ হয় তাহা বলিয়া ত' বোধ হয় না। কেননা আমি দেখিয়াছি যে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধন রত্নাদি থাকিলেও অর্থলালসার কিছুমাত্র হ্রাস হয় না, বরং যাহার যত অধিক ধন রত্নাদি থাকে তাহাকে ততই অর্থ পিশাচ বলিয়া বোধ হয়। এমতস্থলে টাকা কড়ি ধন রত্নকে কেমন করিয়া সম্পত্তি বলিতে পারি। যাহা প্রাপ্তি হইলে আর অপর কিছুই প্রাপ্তির ইচ্ছা থাকে না তাহাকেই প্রকৃত সম্পত্তি বলা যাইতে পারে।

যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ। 
যস্মিন্ স্থিতো দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে ।
(গীতা ৬ অঃ ২২ শ্লোক) 

অর্থাৎ যে অবস্থা লাভ করিলে অপর কিছু লাভকে তাহা অপেক্ষা অধিক বলিয়া মনে হয় না। এবং যে অবস্থায় থাকিলে মহাদুঃখ অভিভূত করিতে পারে না। এই অবস্থাই সম্পত্তি, উহাই যোগ সম্পত্তি, উহাকে যৌগৈশ্বর্য্যরূপ সম্পত্তি বলা যায়। পূর্বে চক্ষুতে যে বায়ু স্থির করার কথা বলা হইয়াছে সেইরূপ চক্ষুতে বায়ু স্থির হইলেই বা করিতে পারিলেই যে অবস্থা হয় তাহাই প্রকৃত সম্পত্তি। উক্ত অবস্থা প্রাপ্ত হইলে জীবের আর প্রাপ্তির ইচ্ছা থাকে না, এবং অভাব বা অশান্তি থাকিতে পারে না। এই অবস্থাকেই শ্রী কহিয়া থাকে। এক্ষণে ক্ষেত্রটা কি এবং কাহাকেই বা ক্ষেত্র বলে তাহাই দেখা যাউক। ক্ষেত্র বলিতে আমি সাধারণতঃ শস্য ক্ষেত্রই বুঝিয়া থাকি, অর্থাৎ যে জমিতে চাষ আবাদ প্রভৃতি হইয়া থাকে ক্ষেত্র শব্দে তাহাকেই বুঝিয়া থাকি। এখানে কিন্তু ক্ষেত্র শব্দে তাহা বুঝিলে চলিবে না। এখানে আমার দেহকেই ক্ষেত্র শব্দে বুঝিতে হইবে।

রামপ্রসাদও এই অর্থেই গাহিয়াছেন “মন তুমি কৃষি কাৰ্য্য জান না, এমন মানব জমি রইল পতিত আবাদ করলে ফলতো সোনা”। বস্তুতঃ মানব দেহে সমস্তই বৰ্ত্তমান আছে বলিয়া আমার বিশ্বাস। এই দেহেই যে ক্ষেত্র তাহা শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতাতেও উল্লেখ আছে। ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্র মিত্যভিধীয়তে”। বর্ত্তমান মানব দেহই ক্ষেত্র পদবাচ্য। তবে সকল মানব দেহই শ্রীক্ষেত্র পদবাচ্য নহে ইহা নিশ্চয়। কারণ পূর্বোক্তরূপ শ্রীঅবস্থা প্রাপ্ত মানব দেহ অতি বিরল। মানব শরীরকে নারায়ণের মন্দির বুঝিতে হইবে। ইহারই চিত্র যজুর্ব্বেদীয় আভাস সহ বর্ত্তমান উড়িষ্যা দেশের শ্রীক্ষেত্রে (উপদেশ দান করিবার জন্য) চিত্রিত করিয়া রাখা হইয়াছে। এক্ষণে উহার প্রকৃত তত্ত্ব বুঝাইবার লোকাভাব। যজুর্ব্বেদোক্ত কৃষ্ণ যজুই জগন্নাথ বা শ্রীকৃষ্ণ, এবং শুক্ল যজুই বলরাম। মধ্যে সুভদ্রা যিনি অতিশয় মঙ্গলযুক্তা অর্থাৎ কুণ্ডলিনী শক্তিই“যা দেবী বায়বী শক্তিং” ইতি রুদ্র যামল। এই শক্তির চৈতন্য হইলে জীবের সমস্ত মঙ্গল লাভ হয়। ইনি জীব দেহে শুক্লকৃষ্ণের মধ্যমার্গে অবস্থিত থাকেন। চিত্রতেও তাহাই দেখান হইয়াছে অর্থাৎ সুভদ্রাকে কৃষ্ণ বলরামের মধ্যভাগে রাখা হইয়াছে। হস্ত পদাদি কাহারও দেওয়া হয় নাই তাহার কারণ উহাতে সংযম ভাবেরই লক্ষণ দেখান হইয়াছে। যেখানে পূর্বোক্তরূপ শ্রীমন্দির সেইখানেই অর্থাৎ সেই দেহরূপ মন্দিরেই সর্বদা জগন্নাথ দেব ও বলরামই দেদীপ্যমান থাকেন। শ্রীমন্দির ব্যতীত অপর সাধারণ দেহরূপ মন্দিরে তাঁহার প্রকাশ থাকিয়াও অপ্রকাশ। প্রকাশ থাকিয়াও অপ্রকাশ বলিবার তাৎপর্য এই যে জীবের লক্ষ্য না থাকার দরুণ অপ্রকাশ। যাহা হউক উহা না হয় একপ্রকার মানিয়া লইলাম, কিন্তু মন্দিরের বর্হিভাগে ঐরূপ কুৎসিত ভাবের চিত্র অঙ্কিত করিবার অভিপ্রায় কি তাহা তা আমার জানা হইল না। অবশ্য আমার কথার দ্বারা যে জানা হইবে তাহা হইতে পারে না। প্রকৃতরূপে জানিতে হইলে কার্য্যের দরকার, কথায় প্রাপ্তির ইচ্ছা হয় মাত্র অপর কিছুই হয় না। যাহা হউক এখন চিত্র সকল যে কি অভিপ্রায়ে মন্দিরের বহির্ভাগে চিত্রিত করিয়া রাখা হইয়াছে তাহাই জানিতে চেষ্টা করা যাউক। বস্তুতঃ মন্দিরের উপরিভাগে কুৎসিত চিত্র সমুদায় যাহা অঙ্কিত রহিয়াছে তাহা একেবারে অগ্রাহ্য নহে। অর্থাৎ দেহ মন্দিরের ভিতরস্থিত ভাব সকল মন্দিরের ভিতরেই চিত্রিত করিয়া রাখা হইয়াছে, তবে বাহিরের ভাব বাহিরে চিত্রিত না থাকিবে কেন? দেহস্থিত ইন্দ্রিয়গণ সমস্তই বহির্মুখ এবং তাহাদের কার্যাও সমস্ত বহির্মুখী। মন্দিরের বাহিরে যে সমস্ত কুৎসিত চিত্র দেখান আছে, তৎ সমুদয়ই ইন্দ্রিয়ের ও রিপুগণের কার্য্যের পরিচায়ক। সুতরাং উহা বাহিরে থাকাই উচিত। দেহের ও বহির্ভাগেই উহারা থাকে, সুতরাং মন্দিরেরই বা বাহিরে না থাকিবে কেন? বরং থাকারই দরকার। যেখানকার যে জিনিষ সেইখানেই তাহা থাকা উচিত। আর ইহা হইতে যে শিক্ষণীয় বিষয় নাই তাহাও নহে। দোষ ভাগ ব্যক্ত হইলে বা প্রকাশ থাকিলে তাহা হইতে জীব সাবধান থাকিতে পারে। পাপ কাৰ্য্য যত গোপন থাকিবে ততই অশান্তি বৃদ্ধি পাইবে এবং পাপ কার্য্যও বৃদ্ধি পাইবার সম্ভাবনা। যদি উক্ত চিত্র দেখিয়া আমার আমোদ না হইয়া ঘৃণা বা লজ্জা হয়, তাহা হইলে আমার পক্ষে উহা একেবারে মন্দ নয়, কারণ যাহা একেবারে ঘৃণা বা লজ্জার বিষয়, তাহা আমার পরিত্যজ্য হওয়াই উচিত। ইহার দ্বারা ব্যাভিচারের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যাইতে পারে। কারণ সকল বিষয়ের ব্যাভিচারই পাপ। রিপুগণের অপব্যবহারই ব্যাভিচার। জগন্নাথ দেবের মন্দিরের বহির্ভাগে যে সকল কুৎসিত চিত্র অঙ্কিত করা আছে তারা ইন্দ্রিয় এবং রিপুগণের অপব্যবহারই প্রকাশ পাইতেছে। সুতরাং তাহা পাপ। দেহ মন্দির অভ্যন্তরস্থিত জগন্নাথ দেবকে দর্শন করিতে হইলে দেহের বর্হিভাগস্থ ইন্দ্রিয় বিষয়ে লক্ষ্য থাকিলে বা তৎ বিষয়ে আসক্ত হইলে দেহ মন্দিরের ভিতরস্থিত জগন্নাথ দেবের দর্শন লাভ হয় না। এই সকল ইন্দ্রিয় বিষয় পরিত্যাগও হইবার নহে এবং পরিত্যজ্যও নহে। তবে সকল বিষয়েরই সদ্ব্যবহার হওয়া বা করা উচিত। সকল বিষয়ের ন্যায্য ব্যবহারে শুভফলই উৎপন্ন হইয়া থাকে। মূৰ্ত্তিত্রয়ে হস্ত পদাদি না দিয়া হস্তপদের সংযত ভাবই দেখান হইয়াছে, নচেৎ তাঁহার যে হস্তপদাদি নাই তাহা বলিতে পারি না কারণ “অনেক বাহুদর বক্রনেত্রম্” (গীতা ১১ অঃ ১৬ শ্লোক)। অর্থাৎ তাঁহার অনেক বাহু, উদর, মুখ ও চক্ষু। সুতরাং তাঁহার যে হস্ত নাই তাহা কেমন করিয়া বলিতে পারি? বরং হস্ত আছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। আরও বিশেষ ব্রহ্মাণ্ডই সমগ্র হস্তপদাদি যে তাঁহারই হস্তপদাদি। আমি হাত পা ওয়ালা আর আমার জগন্নাথ ঠুটো; ইহা কখনই হইতে পারে না। বস্তুতঃ দেখিতে যাইলে আমিই ঠটো; আমার হস্তপদাদি থাকিয়াও নাই, কারণ হস্তের অপর একটি নাম বহু। বাহু অর্থে যদ্বারা বহন করা যায়। এক্ষণে বহন করে কে তাহাই দেখি। আমার বর্ত্তমান অস্থিমাংসের যে হস্ত তাহাই কি বহন করিতে সক্ষম? তাহা ত' হইতে পারে না, কারণ একটা শবদেহেও হস্তপদাদি দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু সে হস্তত কোন বস্তু গ্রহণ করিতে পারে না। সুতরাং বস্তু গ্রহণের মূলীভূত কারণ বর্ত্তমান অস্থিমাংসের গঠিত হস্ত হইতে পারে না। ইহা বস্তু গ্রহণের গৌণ কারণ হওয়াই সম্ভব। যখন জীবের জীবনীশক্তি ব্যতীত কেহই কোন কাৰ্য্যক্ষম নহে, তখন বর্ত্তমান হস্তপাদদিকে বস্তু গ্রহণের মুখ্যকারণ না বলিয়া ইহাদিগকে বস্তু গ্রহণ করণের গৌণ কারণ রূপ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বলাই উচিত। আমার বর্ত্তমান অস্থিমাংসের পদদ্বয় ও তদ্রূপ আমার চলিবার পক্ষে গৌণ কারণ। প্রকৃত পদদ্বয় ইহা নহে “পদং হংস মুদাহৃতম্”। হংসই প্রকৃত পদশব্দ বাচ্য। হংসরূপ পদ না থাকিলে; পাও চল না, হাতও নড়ে না, এই হংসরূপ পদদ্বয়ই প্রকৃত হস্তপদবাচ্য। জগন্নাথের ঠুটো হস্তপদের উপলক্ষ্য করিয়া হংসরূপ হস্তপদের সংযম অবস্থা যাহা, তাহাই জগন্নাথ দেবের মূর্তিতে দেখান আছে। ঘটে বা পটে হংসের সংযম ভাব দেখান যায় না, একারণ ঠটো হস্তপদকে উপলক্ষ্য করিয়া বহিরঙ্গ হস্তপদের সংযমচ্ছলে হংসের সংযম অবস্থাই দেখান হইয়াছে, তদ্ব্যতীত অপর কিছুই নহে। বর্ত্তমান জীবদেহের আভ্যম্ভরিক বিষয় ও বহিবিষয়কে লইয়া যজুর্বেদের সহিত ঐক্য করিয়া শ্রীক্ষেত্রের মন্দির এবং মন্দিরের অভ্যন্তরস্থ দেবমূৰ্ত্তিত্রয় প্রস্তুত হইয়াছে তাহাতে আর সন্দেহ নাই। মন্দিরের অভ্যন্তরস্থ দেবতাত্রয় শ্রীশ্রীজগন্নাথ ও বলরাম এবং সুভদ্রা। শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবই জীবের জীবন স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম ইনি বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে অষ্টম অবতার বলিয়া প্রসিদ্ধ। বলরাম দেবের যে হস্ত ছিল না তাহা নহে। তাঁহার ধ্যান পাঠের দ্বারা জানা যায় যে তাহার চতুর্ভূজ ছিল। বলরাম দেবের অপর নাম যাহা আছে তাহার মধ্যে একটি নাম বলভদ্র। বলভদ্র শব্দের অর্থ বলশক্তি, ভদ্র শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠশক্তি সম্পন্ন যিনি তিনিই বলভদ্র। স্থিরত্বই প্রধান শক্তি বা বল। যেখানে স্থিরত্বের অভাব সেখানে শক্তিও তাদৃশ থাকে না। অর্থাৎ চঞ্চল প্রাণের স্থির ভাবই বল স্বরূপ, আর বলরাম শব্দের অর্থ—বল-শক্তি, রাম-রম ক্রীড়া করা অর্থাৎ যিনি রমার সহিত রমণ করেন তিনিই রামশব্দ বাচ্য। রমা-চঞ্চলা প্রাণশক্তি ইনিই আদ্যাপ্রকৃতি এই চঞ্চলা প্রাণশক্তির মধ্যে যে স্থিরত্বের ক্রীড়ারূপ অবস্থা তাহাই বলরাম পদবাচ্য। ইনিই শুক্ল যজুঃ। তাহার পর বলরাম দেবের অপর একটি নাম লাঙ্গলী অর্থাৎ যাঁর লাঙ্গল আছে। তিনি লাঙ্গলধারী ছিলেন। লাঙ্গল ধরিবার তাৎপর্য্য এই যে তিনি যে অস্ত্রের অভাব বশতঃ লাঙ্গল ধরিতেন তাহা নহে। উহাতে জীবের আত্মোন্নতি করিবার একমাত্র উপায় সম্বন্ধে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। ক্ষেত্র কর্ষণ দ্বারা আত্মোন্নতি লাভ হইয়া থাকে এবং তিনি যে একজন শরীররূপ ক্ষেত্রকর্ষণকারী ও গুরুরূপী কৃষক অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞ তাহাই বুঝাইতেছেন। প্রাণের স্থিরাবস্থারূপ পরমাত্মাই ক্ষেত্রজ্ঞ (গীতা ১৩ অঃ ২ শ্লোক) অর্থাৎ প্রাণের প্রাণ, ‘প্রাণস্য প্রাণঃ' ইতি শ্রুতিঃ। আর শ্রীকৃষ্ণকেই জগন্নাথ বলা হইয়া থাকে। বাস্তবিক শ্ৰীকৃষ্ণই যে জগন্নাথ দেব তাহাতে আর আমার সন্দেহ মাত্র নাই। কারণ শ্রীকৃষ্ণকে জীবের জীবন স্বরূপ বলা হইয়া থাকে। জীবের জীবনই প্রাণ। প্রাণ ব্যতীত জীবের অস্তিত্ব কোথায়? জগতের জীবের প্রাণ দ্বারায় যখন জীবের ঘোষণ হইতেছে এবং তাহা দ্বারাই যখন জীবের অস্তিত্ব রহিয়াছে, তখন তিনিই সমগ্র জীবের নাথ, সুতরাং তাঁহাকে জগন্নাথ না বলিব কেন এবং তাহার পূজাই বা না করিব কেন? বরং করা ত’ উচিত। তবে পূজা আমার বিধি পূর্বক জানা নাই, এবং পূজা কাহাকে বলে তাহাও জানি না। পূজা অর্থে সম্বৰ্দ্ধন করা, সম্বৰ্দ্ধন – সম্যক বৃদ্ধি করা। এখানে সম্যক রূপে বৃদ্ধি কাহাকে করিতে হইবে তাহাও আমার জানা উচিত। উপরোক্ত জগন্নাথও বলরামের সম্যকরূপে বৃদ্ধি করিয়া অর্থাৎ স্থিরত্বের ও চঞ্চল প্রাণের সম্যক বৃদ্ধি করণ রূপ সম্বৰ্দ্ধনা করিয়া বাস্তবিক অন্তর্ভাবের পূজা করিতে হইবে। বাহা পূজায় উহা হইবার নহে। উপরোক্ত সম্বর্জন রূপ পূজা করিতে করিতে কুণ্ডলিনী শক্তিরূপা বায়ুরূপিণী সুভদ্রা আপনিই প্রকাশ হইয়া থাকেন। ইনি কল্যাণদাত্রী বলিয়া ইহার নাম সুভদ্রা। ইহার পর আমার শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে আরও কিছু বলিবার আছে। কারণ যাহা বলা হইয়াছে তাহাতে যেন আমার সম্যক তৃপ্তি হইতেছে না। শ্রীকৃষ্ণ কৃষ্ণ আকর্ষণ করা, টানিয়া আনা বা টানিয়া লওয়ার নাম আকণে। আর কৃষ্ণ ধাতু অর্থে কর্ষণ করা রূপ কৃষিকর্ম অর্থাৎ জীবদেহে অজপা রূপ ক্রিয়া স্বভাবতঃ যাহা চলিতেছে তাহাই কৃষিকর্ম। সেই কৃষিকর্মের নিবৃত্তি রূপ অবস্থাই কৃষ্ণ শব্দবাচ্য।

“কৃষি ভূর্বাচকঃ শব্দো নশ্চেনিবৃত্তি বাচকঃ। 
তয়োরৈক্যং পরমব্রহ্ম কৃষ্ণ ইত্যাভিধীয়তে।”

এই অবস্থাই জীবকে টানিয়া লইয়া সংসার হইতে মুক্তি দিয়া থাকে। জীবের ইহাতে লক্ষ্য না থাকায় সংসারাসক্তি যাইতেছে না। সম্বন্ধন রূপ পূজা ব্যতিরেকে জীব উহাতে লক্ষ্য করিতে সক্ষম নহে। যাহা হউক এক্ষণে যেন আমার কতকটা তৃপ্তি বোধ হইতেছে। তবে শ্রীকৃষ্ণ ও অপর দেবদেবীর মূর্ত্তি যাহা আমি দেখিয়াছি, তাহাতে রূপের পার্থক্য থাকায় যেন আমার সন্দেহ বৃদ্ধি পায়।

পূর্বে এ সম্বন্ধে সন্দেহ বৃদ্ধির কোনও কারণ ছিল না। কারণ এ দেশ হইতে অন্য প্রদেশে যাতায়াতের তত সুবিধা ছিল না। কিন্তু এক্ষণে যাতায়াতের সে অসুবিধা না থাকায় লোকে অনায়াসে এক প্রদেশ হইতে অন্য প্রদেশে যাতায়াত করিতে পারে এবং ঘটনাক্রমে যাতায়াতের সুবিধা করিতে না পারিলেও অন্যান্য লোক অতি সহজেই অন্য প্রদেশ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করিতে পারে। এইরূপে জ্ঞান লাভ করিয়া কোন কোনও বিষয়ে আমার সন্দেহ বৃদ্ধি পাইতেছে। যেমন আমার বাঙ্গালা দেশের কৃষ্ণ বা মহাদেবের চিত্র এক রকম, এবং বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রদেশের চিত্র অন্য রকম। এমন ক্ষেত্রে কোন্ চিত্র ঠিক এ বিষয়ে আমার সন্দেহ হইবারই কথা। তবে আমার বোম্বাইয়ের চিত্রের প্রতি আজকাল আস্থা বেশী হইয়াছে। বেশী হইবার কারণ, আমার বিশ্বাস বোম্বাইয়ের জিনিস খুব ভাল, এবং তথাকার সবই ঠিক সুতরাং আমার দেশের শ্রীকৃষ্ণ বা মহাদেবের মূর্তি ঠিক নয়। যাহা হউক এই মূর্ত্তির পার্থক্য থাকায় আমার বোধহয় যে এই সকল মূৰ্ত্তি তাঁহাদের (দেব দেবীর) যথার্থ গঠন নিজে দেখিয়া ঠিক তদনুযায়ী কখনই চিত্রিত করা হয় নাই। দেব দেবীর মূর্ত্তি স্বচক্ষে দেখিয়া সেই দেব দেবীর প্রকৃত গঠনানুযায়ী চিত্র প্রস্তুত করিলে এই মূর্তি বৈষম্য কখনই ঘটিত না বলিয়া আবার বোধ হয়। যেমন আমার ফটোগ্রাফ বা চিত্র যদি ভিন্ন ভিন্ন দেশের লোকের দ্বারা চিত্রিত হয়, তাহা হইলে ঐ সকল চিত্রে কখনই পার্থক্যভাব থাকিতে পারে না। এ কারণে আমার মনে হয় যে, দেবদেবীদের যে সকল চিত্র আমি দেখিতে পাই তাহা সমস্তই চিত্রকরগণ নিজ দেশের লোকের আকার প্রকার অনুযায়ী প্রস্তুত করিয়া থাকে এবং তদুপরি লোকের চিত্র আকর্ষণ করিবার জন্য ঐ সমস্ত চিত্রগুলিকে অলকা তিলকা দিয়া সাজাইয়া থাকে মাত্র। ইহাতেই প্রতীয়মান হইতেছে যে, লোকে আপন আপন ইচ্ছামত মূর্ত্তি গঠন করিয়া থাকে, বস্তুতঃ আমি যে সব শ্রীকৃষ্ণ বা শিবের ছবি বা মূর্ত্তি দেখিয়া থাকি তাহা নিশ্চয়ই প্রকৃত মূৰ্ত্তি নহে, উহা আপন আপন কল্পনাপ্রসূত ছবি বা মূৰ্ত্তিমাত্র। যাহা ইউক এক্ষণে আমার প্রাণ কৃষ্ণই যে প্রকৃত কৃষ্ণপদবাচ্য অপর সব চিত্র মাত্র তাহাতে আর আমার সন্দেহ মাত্র নাই। এক্ষণে আমার মনে আর একটু সন্দেহ আসিতেছে যে দেবতাদিগের যে সকল মূৰ্ত্তি আমি দেখিতেছি, তাহা যদি জীবের আপন আপন ভাবের কল্পনাপ্রসূতই হয় তাহা হইলে সেই মূর্ত্তি সকল আমার পূজ্য কি প্রকারে হইতে পারেন এবং প্রতিমার আবশ্যকতাই বা কি? এবং কাহার কাহার মুখে শুনিয়াছি যে মূর্তি পূজার অপেক্ষা নিরাকারের উপাসনায় থাকাই ভাল। তাঁহারা বলেন তিনি যখন বাক্য ও রূপের অতীত তখন আবার তাঁহার মূর্ত্তি কিরূপে হইতে পারে। এইসব নানাপ্রকার সাকার নিরাকার দ্বৈতাদ্বৈতবাদ থাকায় প্রথম হইতেই মূৰ্ত্তি পূজা সম্বন্ধে আমার দারুণ সন্দেহ ছিল। তাহার উপর শ্রীকৃষ্ণ বা জগন্নাথ সম্বন্ধে সন্দেহ যাহা ছিল তাহা আরও দৃঢ়তর হইল। বস্তুতঃ আমার সন্দেহ করিবার কোনও কারণই নাই, তবে আমার প্রত্যক্ষ জ্ঞান যতক্ষণ না হইবে ততক্ষণ আমার সন্দেহ যাইবার নহে। যেমন এই জগৎ আমি ইন্দ্রজাল মরীচিকাবৎ বা স্বপ্নবৎ এই কথাই শুনিয়াছি, কিন্তু বৰ্ত্তমান জগৎ আমার প্রত্যক্ষ দেখা থাকা হেতু আমি যেমন জগৎকে স্বপ্নবৎ বা ইন্দ্রজাল ও মরীচিকাবৎ হঠাৎ কাহারও কথায় স্বীকার করিতে পারি না, তদ্রুপ ভগবানের মূর্ত্তি সম্বন্ধে আমার প্রত্যক্ষ জ্ঞান ( জানা) না থাকায় সন্দেহ হইবারই কথা, তাহা নিতান্ত দূষণীয় নহে। বস্তুতঃ মূর্ত্তির যে আবশ্যকতা একেবারেই নাই তাহা বলিতে পারি না। কারণ স্বল্পবুদ্ধিযুক্ত মানবরূপী জীব বিনা অবলম্বনে উপাসনা বা পূজা করিতে পারে না। বিনা অবলম্বনে স্থির থাকা জীবের পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব। তাহা হইতেই পারে না। এ কারণ স্বল্পবুদ্ধিযুক্ত মানবরূপী জীবের পক্ষে মূর্তি পূজাই শ্রেয়ঃ। এ স্থলে আমি যখন আমাকে স্বল্পবুদ্ধিযুক্ত মনে করি না তখন আমি কেন মূর্তি পূজার অধিকারী হইতে যাইব; আমি মূর্ত্তি পূজার অধিকারী নহি, তাহার কারণ পাশ্চাত্য বিদ্যা বা বেদান্তাদি পাঠের দ্বারা আমার যখন স্বল্পবুদ্ধি তিরোহিত হইয়াছে তখন আমি নিশ্চয়ই সেই নিরাকার ব্রহ্মের বা আমার উপাসনা করার যোগ্য পাত্র ইহাও কি আমি বলিতে পারি না। বস্তুতঃ আমি ইহা বলিলে আমাকে বাধা দেয় কে? আর বাধা দিলেই বা আমি শুনিব কেন, আমি জোর করিয়া করিব, ইহাতে আমার বাধা দিবার অধিকার কাহারও নাই। এমত অবস্থায় যাহার যাহা ইচ্ছা সে তাহাই স্বেচ্ছাচারী ভাবে করিতে পারে সত্য, কিন্তু ইহা ন্যায়সঙ্গত নহে। কারণ ঈশ্বর তত্ত্ব, আত্ম তত্ত্ব, বা ব্রহ্ম তত্ত্ব সম্বন্ধে মানব মাত্রেই স্বল্প বুদ্ধি জীব বলিয়া পরিগণিত। আমার ব্যাকরণের বা বেদবেদান্তের জ্ঞান বা পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের জ্ঞানের দ্বারায় তথায় পৌঁছিবার উপায় নাই, কারণ উহা দ্বারা কেবল কতকগুলি শব্দ মুখস্থ করিয়াছি মাত্র, তদ্ব্যতীত আর কিছু আমার লাভ হয় নাই। বরং উহা পাঠের দ্বারা আমি আত্ম তত্ত্ববিৎ না হইয়া আমার সন্দেহই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে, অধিকন্তু নাস্তিকতার ভাব আসাতে অশান্তির স্রোতে ভাসিতে হইতেছে।

“সপুরাণাপঞ্চবেদান শাস্ত্রাণি বিবিধানি চ।
জ্ঞাত্বাপ্যনাত্মবিতেন নারোদোহতি শুষোচ হি।।
 বেদভ্যাসাৎ পুরাতাপত্রয় মাত্রেণ শোকিতা।
পশ্চাত্ত্বভ্যাস বিস্মার ভঙ্গ গর্ব্বৈশ্চ শোকিতা ইতি। পঞ্চদশী৷৷ ”

অর্থাৎ নারদ পুরাণের সহিত পঞ্চবেদ ও বিবিধ শাস্ত্র জানিয়াও আত্মতত্ত্ববিৎ হইতে না পারায় শোকাকুল হইয়াছিলেন। বেদাধ্যয়নের পর পাঠ বিস্মরণ অবমাননা ও গর্ব হেতু তাঁহার মনের আরও অশান্তি হইয়াছিল। নারদেরই যখন শাস্ত্র পাঠের দ্বারায় ঐরূপ হইয়াছিল তখন আমার ন্যায় জীবের পক্ষে যে কি না হইতে পারে তাহা বলিতে পারি না। সকলই সম্ভবপর বলিয়া বিবেচনা হয়। নারদকেই যখন স্বল্পবুদ্ধি মানবের ন্যায় শোকাকুল হইতে হইয়াছিল তখন আমার ন্যায় স্বল্পবুদ্ধি মানবের সকলই সম্ভব। এ কারণ বেদাদি পাঠ করিলেই যে আমি জ্ঞানী হইলাম ইহা মনে করা আমার বাতুলতা ব্যতীত আর কিছুই নহে। সাধনালব্ধ আত্মতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি ব্যতীত অপর সকলেই ঈশ্বর তত্ত্ব সম্বন্ধে স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন মানব। আমি যখন স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্নই হইলাম তখন আমি নিশ্চয়ই মূৰ্ত্তি পূজার অধিকারী। ইহাতে আমার মনে হইতে পারে যে মূর্তি ব্যতীত কি আমার উপাসনা বা পূজা হইতে পারে না? আমি নিরাকারেই তাঁহার উপাসনা বা পূজা করিব। নিরাকার অবস্থার উপাসনা বা ধ্যান পূজা হইতে পারে না, কারণ নিরাকার বলিতে গেলেই প্রথমতঃ এক শূন্যকেই বলিতে হয়। সাধারণ জীবের সমস্তই চঞ্চলভাবে পরিপূর্ণ। তাহার পক্ষে নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা বা ধ্যান করা বিড়ম্বনা মাত্র। কারণ নিরাকার বলিতে গেলে এক শূন্যকে বুঝায় শূন্য ব্যতীত সবই সাকার, শূন্যের ধ্যান করিতে গেলেই আমার সম্মুখে সমস্ত বিষয় আসিয়া পড়ে। আমার চতুদিকেই শূন্য রহিয়াছে আমি শূন্যের মধ্যে থাকিয়াও শূন্যে লক্ষ্য বা ধ্যান করিতে পারি না। আমি আমার সম্মুখস্থ শূন্য পদার্থ যখন দেখিতে যাই, তখন আমার লক্ষ্য শূন্যে না পড়িয়া বাড়ী, ঘর, গাছ, পালা ইত্যাদিতে পতিত হয়। যখন অপর বস্তু দেখিতে পাইতেছি, তখন নিশ্চয়ই আমার শূন্য দর্শন হইতেছে না। যেমন আমি একটি স্থানে বসিয়া আছি এবং আমার সম্মুখেই অপর একটি লোকও বসিয়া আছেন, আমাদের উভয়ের মধ্যস্থলে যে স্থান বর্তমান থাকে, তাহাই শূন্যস্থল; দুঃখের বিষয় আমার লক্ষ্য শূন্যস্থলে না পড়িয়া আমার সম্মুখস্থ লোকটির উপরি পতিত হইয়া থাকে। যদি আমার শূন্যেতে লক্ষ্য থাকিত তাহা হইলে আমার সম্মুখস্থ লোকটিকে নিশ্চয়ই, দেখিতে পাইতাম না। যখন আমার সম্মুখস্থ লোকের রূপ বা অপর বিষয় দর্শন হইতেছে, তখন নিশ্চয়ই শূন্য দর্শন হইতেছে না বলিতে হইবে। যদি আমার মস্তকের উর্দ্ধদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া শূন্য দর্শন করিতে যাই তাহাতেও আমার শূন্য দর্শন না হইয়া আকাশস্থ মেঘ, চন্দ্র, সূর্য্য্য বা নক্ষত্র দৃষ্টিপথে পতিত হয়। চন্দ্র, সূৰ্য্য, মেঘ, নক্ষত্র ইহারা নিশ্চয়ই শূন্য নহে, তাহা হইলে আর আমার শূন্য দর্শন কোথা হইতে হইল। আমার শূন্য দর্শন হইতেছে ইহা বলাটাও আমার একপ্রকার বাতুলতা ব্যতীত অপর কিছুই নহে। এরূপ অবস্থায় শূন্য স্বরূপ নিরাকারের ধ্যান করা বা করিতে যাওয়া কি বিড়ম্বনার বিষয় নহে? জীব ভাবের অবস্থায় নিরাকার বাদ অবলম্বন করা বিধেয় নহে, কারণ জীবভাবে নিরাকার অবলম্বন করা এক প্রকার নাস্তিকতার সোপান মাত্র। জীব প্রথম হইতে নিরাকার পথ অবলম্বন করিলে কালে জীবকে নিশ্চয়ই যে ব্যাভিচারগ্রস্ত হইতে হইবে তাহাতে আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই, যদিও কোন গতিকে ব্যাভিচারের হস্ত হইতে অব্যাহতি পাই তবে অর্ন্তদাহে যে আমরণ পুড়িতে হইবে, তাহাতে আর কোন সন্দেহ নাই। ব্যাভিচারের হস্ত হইতে আমাকে রক্ষা করিতে গেলে, আমাকে আজীবন ইন্দ্রিয়গণের ও রিপুগণের প্রবাহের বিরুদ্ধে চলিতে হইবে। একে ইন্দ্রিয়গণের ও রিপুগণের খরতর স্রোত তাহার উপর আমার অন্তরস্থ যে বায়ু চলিতেছে তাহাও আমার অনুকূল নহে, বরাং উহা- ইন্দ্রিয়গণের ও রিপুগণের স্বপক্ষেই বহিতেছে। এরূপ অবস্থায় আমার দেহরূপ জীর্ণ তরণী কতক্ষণ চলিতে পারে? তাহা যে নিশ্চয়ই অকালে ভগ্ন হইবে তাহাতে আর সন্দেহ মাত্র নাই। নিরাকারের সাধনে ভক্তি বা প্রেম হইতে পারে না, কারণ ভক্তি শব্দের অর্থ, ভজ, সেবকরা বা পূজ্য ব্যক্তির প্রতি অনুরাগ; এক্ষণে নিরাকারের সেবা কিরূপে হইতে পারে তাহাত বুঝি না। সেবা করিতে গেলেই আকার আসিয়া পড়ে, আকার না থাকিলে সেবা হইতে পারে না, যিনি আকার ও অবয়ব হীন তাঁহাকেই নিরাকার বলা যাইতে পারে এবং তাঁহার সেবা হইতে পারে না। এস্থলে যদি এরূপ বলি তিনি আমার ন্যায় হস্তপদাদি বিশিষ্ট নহেন, তিনি সেই তেজঃস্বরূপ, তেজঃস্বরূপের সেবা করিব বা তেজের উপর অনুরাগ রাখিব, ইহাতে আর দোষ কি? বস্তুতঃ ইহাতে যে দোষ নাই তাহা নহে, কারণ তেজঃস্বরূপ বলাতেও রূপ আসিতেছে। প্রথমতঃ এই কথায় তাঁহার রূপাতীত অবস্থায় দোষ পড়িতেছে, কারণ আমি তাঁহাকে রূপাতীত বলিয়া শুনিয়াছি, রূপ থাকিলে রূপাতীত কেমন করিয়া বলি। তেজঃস্বরূপ বা জ্যোতিঃস্বরূপ বলিলে আর রূপাতীত বা নিরাকার বলা যাইতে পারে না। এবং বলাও উচিত নয়, এমতস্থলে তাঁহাকে নিরাকার না বলিয়া জ্যোতিঃস্বরূপ বা তেজঃস্বরূপ বলাই উচিত, তিনি নিরাকার বলা সঙ্গত হয় না। তাহার পর কথা হইতেছে যদি তিনি সত্যই তেজঃস্বরূপ বা জ্যোতিঃস্বরূপ হন, তাহা হইলেও আমার সেই জ্যোতির বা তেজের উপর অনুরাগ আসিতে পারে না কারণ সেই তেজ বা জ্যোতিঃ আমার দর্শনাভাব হেতু ধ্যান করিব কার? দর্শনাভাব জনিত, অনুরাগ বা সেবা বা ধ্যান কিছুই হইল না বরং ভ্রষ্টাচারে পরিণত হইল। পতি ব্যতীত যেমন পতি-প্রেম হইতে পারে না তদ্রূপ জ্যোতিঃ বা তেজ আমার নিজ প্রত্যক্ষ দর্শনাভাব থাকায় ইহাতেও অনুরাগ বা প্রেম হইতে পারে না বরং তাহাতে চিরজীবন কুমারীর ন্যায় থাকিয়া নানা জ্বালা সহ্য করিতে হইবে। আজীবন কুমারী অবস্থায় থাকা যে জ্বালা হয় তাহা চিরকুমারী ব্যতীত অপরের বোধগম্য নহে। অপরাপর বিষয় সমস্ত কল্পনার চক্ষে দেখিলে তাহাতে তত যায় আসে না, কিন্তু পতি অভাবে পতি কল্পনা করা বোধহয় ঠিক নহে। আমি এ পর্যন্ত আমার পতি কে তাহা জানিতে না পারায় পতি পরিবর্তন যে কতবার হইল তাহা ব্যক্ত করিতেও আমার লজ্জা বোধহয়। আমার পতিকে কখন সাকার বলিয়া তাঁহার মূর্ত্তি কল্পনা করিয়া তাঁহার সেবা করিতে যাই, আবার কখন বা নিরাকার বোধে ব্যস্তভাবে ধরিতে গিয়া শেষে পড়িয়া যাই। শূন্যকে যেমন লাফাইয়া উচ্চদিকে ধরিতে গেলে আমার পতন নিশ্চয় হইয়া থাকে, তদ্রূপ নিরাকার বোধে ভগবানকে ধরিতে গেলেও আমার পতন অবশ্যম্ভাবী। সাকারেও যে আমার তৃপ্তি হইতেছে তাহাই বা কেমন করিয়া বলিতে পারি। কারণ মৃৎশিলা ধাতু বা দারু দ্বারায় গঠিত প্রতি মূর্তিতে কি আমার পতি- প্রেমের বা পতি-সহবাসের সুখরূপ আনন্দ অনুভব করিতে পারা সম্ভবপর? তাহা বোধহয় কখনও নহে, তাহার উপর আমার যে পতিরূপ গঠিত হইয়া আমার সম্মুখে রক্ষিত হইয়াছে তাহাও আমার পতিকে না দেখিয়া একটা কল্পনার চক্ষে মূর্ত্তিগঠন করিয়া তাহাকেই আমার পতি বলিয়া সম্বোধন করিতে বলা হইতেছে। ইহা আমার মন আর কতকাল মানিয়া লইয়া চলিতে পারে। এরূপ ভাবে সাকার উপাসনাও দোষশূন্য না হইলেও নিরাকারের উপাসনা অপেক্ষা যে ইহা শ্রেষ্ঠ তাহাতে আর সন্দেহ নাই। নিরাকার অপেক্ষা সাকারকে শ্রেষ্ঠ বলিবার কারণ, জীব অবলম্বন ব্যতীত দাঁড়াইতে পারে না। এবং অবলম্বন যতই চিত্ত-মুগ্ধকর হইবে ততই জীবের মন তাহাতে আকৃষ্ট হইবে। যেমত বালক বালিকাগণ চিত্রপুত্তলিকা প্রাপ্ত হইয়া তাহাকে পুত্রকন্যা ভাবে কোলে করিয়া আদর ও স্নেহ যত্ন করিয়া থাকে ইহাতে যে তাহাদের কিছুলাভ হয় না। এমত নহে, অন্ততঃ স্নেহর ও যত্নের শিক্ষার অভ্যাস তাহাতে নিশ্চয়ই হইয়া থাকে এবং বালক বালিকারাও নানারূপ মূর্ত্তি দর্শনে সেই সকল মূর্ত্তির নিকটস্থ হইয়া ঈশ্বর বোধে প্রণামাদি করায় প্রথম হইতে নিজেকে ঈশ্বর সমীপে নত হইবার অভ্যাস করিয়া থাকে। নিরাকারে তাহা হইবার নহে। বালক নিরাকার কি বুঝিবে ঈশ্বর-তত্ত্ব সম্বন্ধে সিদ্ধমুক্ত জীব ব্যতীত সকলেই যে বালকবৎ তাহাও আর অণুমাত্র সন্দেহ নাই, বালকগণ হইতে ঈশ্বর নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া আমার অন্তরে একরকম নাস্তিকতার ভাবই দাঁড়াইয়া গিয়াছে ও যাইতেছে। ঈশ্বর নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ ইহা বোধগম্য হওয়া আমার ন্যায় স্বল্পমতি বিশিষ্ট জীবের পক্ষে যে কত কঠিন হইতে কঠিনতর তাহা বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রেই বুঝিতে পারেন, তবে দুঃখের বিষয় আমি আমাকে বুদ্ধিহীন বলিয়া কিছুতেই স্বীকার করি না। সেই কারণে আমার যত গণ্ডগোল, অশান্তি আসিয়া উপস্থিত হইয়া থাকে। বস্তুতঃ আমি যে ঈশ্বর তত্ত্ব সম্বন্ধে বুদ্ধিহীন তাহাতে আর আমার সন্দেহ নাই।

জীব মাত্রেই চঞ্চল, এবং অযুক্ত, ব্যক্তির আহার নিদ্রা, ভয় ইত্যাদি বিষয়িনী বুদ্ধি ব্যতীত, আত্মতত্ত্ব বা ঈশ্বর তত্ত্ব বিষয়িনী বুদ্ধি নাই, ইহা ধ্রুব সত্য।

“নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য না চাযুক্তস্য ভাবনা। 
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কৃতঃ সুখম্ ।।”

অর্থাৎ অযুক্ত ব্যক্তির আত্ম-বিষয়িনী বুদ্ধি নাই, অযুক্ত ব্যক্তির আত্ম-বিষয়কজ্ঞানও হয় না। আত্ম ধ্যানবিহীন ব্যক্তির শান্তিও নাই, শান্তিহীনের সুখ কোথায় ? সুখের অভাবেই দুঃখ, দুঃখ শব্দের অর্থ খং–ব্রত্ত বৃহত্বাৎ ব্রহ্ম উচ্যতে, আত্মার বৃহত্ত্ব হেতু আত্মাকেই ব্রহ্ম কহা যায়, সেই আত্মব্রহ্ম হইতে দূরে থাকাই দুঃখ। এখানে যদি বলা যায় আত্মব্রহ্ম হইতে দূরে থাকা অসম্ভব, কারণ তিনি যখন সর্বত্রই সমানভাবে রহিয়াছেন তখন আমি তাঁহা হইতে দূরে কিরূপে থাকিতে পারি, দূরে থাকা সম্ভবপর হইতে পারে না, বরং নিকটে থাকাই সম্ভব। বস্তুতঃ তিনি আমার দূরে নাই ইহা ধ্রুব সত্য, কিন্তু তাহা হইলেও আমার আত্মব্রহ্মকে না জানা হেতু আমার পক্ষে দূর, আত্মাকে না জানায় জীবের যত অশান্তি, অশান্তি অপেক্ষা আর বেশী দুঃখ কি আছে বা হইতে পারে ?

যাহা হউক ঈশ্বর নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ এই শুষ্ক এবং বাহ্যিক জ্ঞানের ফলে এখন আর গুরুজনকে কেহ মানিতে চায় না এবং ইহার ফলে আমার সদাচারেরও অভাব আসিতেছে। সদাচার বা নীতিধর্ম ঈশ্বর প্রেম ব্যতীত হইতেই পারে না। ঈশ্বরের প্রত্যক্ষভাবে হেতু প্রেম বা ভালবাসা হয় কি প্রকারে তাহাও আমার বোধ নাই; সুতরাং আমার ঈশ্বর প্রেম এক প্রকার নাই বলিলেও চলে। এমতস্থলে আমার সদাচারী বা চরিত্রবান হওয়া এক প্রকার বিড়ম্বনা মাত্র, আমি যাহা নীতিশিক্ষা করিয়াছি তাহা এক প্রকার ধর্মহীন নীতি বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ধর্মহীন বলিবার অভিপ্রায় এই যে আমি যে ধর্ম পাইয়াছি তাহার অবলম্বন না পাওয়ায়, আমার ধর্ম, অধর্মে পরিণত হইয়া গিয়াছে।

ঈশ্বর সাকার নহেন ইত্যাদি পরের কথায়, আমার না সাকারে আস্থা আছে, না নিরাকারে আছে, আমার উভয় কূলই নষ্টপ্রায় হইয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে এমত অবস্থায় আর নীতি, সদাচার ও চরিত্র রক্ষা হয় কাহার বলে। এই কারণে আমার কার্যা কার্য্যের এক প্রকার কিছুই ঠিক নাই, আমি প্রকাশ্য লোকলজ্জা ভয়ে অনেক সময় অনেক কার্য্য করিতে না পারিলেও গোপনে কোন কার্য্যই করিতে কুণ্ঠিত হই না, কুণ্ঠিত হই না তাহার কারণ আমার প্রবল রিপুগণ আমাকে অবলম্বন শূন্য অবস্থায় পাইয়া তাহারা অনায়াসে আমাকে তাহাদের (রিপুগণের) অভিপ্রেত সদসৎ সমস্ত কার্যাই আমার দ্বারা করাইয়া লয়। এমত অবস্থায় প্রত্যক্ষ সাকার বাদ জীবের প্রথম অবস্থায় জীব মাত্রেরই গ্রহণ করা উচিত, কারণ শূন্য স্বরূপ নিরাকার বাদের অবলম্বন না পাওয়ায় নিরাকার বাদ আমাকে রিপুগণের প্রবল প্রবাহ হইতে রক্ষা করিতে পারিবে না। আরও বিশেষ যাহারা নিরাকার বাদী, তাহারা মুখে সাকার বাদীকে ঘৃণা করিয়া পৌত্তলিক ইত্যাদি শ্লেষ বাক্য সকল বলিয়া কেবল আপনা আপনি একটা বিরোধ বাধাইয়া ধর্ম জগতে একটা দলাদলির ভিত্তি স্থাপন করিয়া পরস্পরের একটা মনোমালিন্য বৃদ্ধি করিয়া থাকে মাত্র। নচেৎ অপর কিছুই তাহাদের লাভ হয় না, ইহা কেবল আমার অজ্ঞানের পরিচয় দেওয়া ব্যতীত অপর কিছুই নহে। বস্তুতঃ তিনি নিরাকারও নহেন সাকারও নহেন, আবার তিনি সাকারও বটেন নিরাকারও বটেন, অর্থাৎ আমার আমির বর্ত্তমান অবস্থায় তিনি নিরাকার কদাচ নহেন ইহা ধ্রুব সত্য। এবং আমার আমির রহিত অবস্থায় তিনি নিরাকার, সেখানে তিনি নাই সেখানে আমিও নাই, যেখানে তিনি আছেন সেখানে আমিও আছি, অর্থাৎ আমার আমিই তিনি, এ আমি, অস্থিমাংসবিশিষ্ট শরীর নহে বা আমি শব্দ আমি নহে, অস্থিমাংস বিশিষ্ট শরীরের ও আমি শব্দের উৎপত্তি স্থানই আমি শব্দ বাচ্য। এই আমি যখন ঘটস্থ হইয়া কার্য্য করি তখন সাকার, স্বভাবের দ্বারায় ঘট ভাঙ্গিলেই নিরাকার, সেই সর্বশক্তিমান নারায়ণ তিনি প্রতি ঘটে বিরাজমান, সাকারবাদীরা সেই নিরাকারের পূজা করিয়া থাকে, তবে যাহারা প্রকৃত পূজা করিতে অক্ষম বা পূজা কর্ম জানে না। তাহাদের জন্যই মৃৎশিলা ধাতু ইত্যাদির অবলম্বন মাত্র সম্মুখে রাখিয়া প্রকৃত আত্মানারায়ণের পূজার অভ্যাস করান হইয়া থাকে, কারণ প্রতিমা স্বল্পবুদ্ধি মানবের জন্যই ব্যবস্থা আছে, ইহা নিরাকার বাদ অপেক্ষা যে শতাংশে শ্রেয়ঃ তাহার সন্দেহ নাই। এই বাহা পূজার ব্যবস্থা যাহা আছে, তাহা সিদ্ধ মুক্ত ব্যতীত সাধারণের অকরণীয় নহে বরং করণীয়, তবে এই বাহ্যকে মুখ্যকর্ম মনে করা চাহি না।

পূজা পদ্ধতিতে যে সব ধ্যান মন্ত্র লিখিত আছে তৎসমুদায়ই প্রায় বায়ু ক্রিয়া অর্থাৎ ভূতশুদ্ধি ন্যাস ইত্যাদি যাহা যাহা লিখিত আছে তাহা দুচার ঘণ্টায় বা দুই চারি বৎসরে কাহারও শেষ করা সাধায়ত্ত নহে, ভূতশুদ্ধির কার্য্যটি শেষ করিতে পারিলেই সাধকের ব্ৰহ্মজ্ঞান স্বতঃই প্ৰকাশ পাইয়া থাকে; এই ভূতশুদ্ধির কার্যটি প্রাণায়াম যোগাভ্যাসী সাধক যদি প্রত্যহ গুরুবাক্যমত বিধিপূর্বক ছয় ঘণ্টাকাল ধরিয়া সাধনা করেন, একদিনও বাদ না যায় তাহা হইলে অন্ততঃ দ্বাদশ বৎসরে তাঁহার ভূতশুদ্ধি কার্য্য সমাপন হইয়া ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ হওয়া সম্ভব, নচেৎ নহে।

দুঃখের বিষয় উপস্থিত কালে একবার পুঁথিখানি প্রথম হইতে শেষ পর্য্যন্ত আবৃত্তি করিয়া পুষ্প পত্রগুলি সম্মুখস্থ দেব বা দেবীর উপর ফেলিয়া দিতে পারিলেই ছুটি, ইহা আর সাকার বাদের দোষ নহে, আমি যদি না জানিয়া কোন কার্য্য জানি বলি তাহা আমারি দোষ।

সম্মুখস্থ দেব দেবীর মূর্ত্তিগুলি জীবকে আস্তিকতা ভাবে রাখিবার উপায় মাত্র নচেৎ অপর কিছুই নহে, দেখিতে পাওয়া যায় ধ্যান মন্ত্র শেষ সময়ের পুষ্টটি নিজের মস্তকে দেওয়া হইয়া থাকে, ইহাতেই বুঝিতে হইবে যাহা কিছু মূর্ত্তি সব নিজ মস্তকের ভিতরে রহিয়াছে। যেমন নারায়ণের পূজা করিতে গেলে আমরা নারায়ণ শিলাকেই পূজা করিয়া থাকি ইহাকে সাকার বিদ্বেষী যাঁহারা তাঁহারা হয়ত বলিবেন পাথর পূজা করিয়া কি হইবে, বস্তুতঃ পাথর পূজা কেহই করেন না, আর যদি পাথর পূজাই হয় তাহাতেই বা দোষ কি? তিনি কি পাথরে নাই? তিনি যখন সর্বত্রই সমান ভাবে বিরাজমান তখন তিনি নাই কোথায়, তবে পূজা বিধি পূর্বক হইলে, তিনি সাধকের হৃদয়ে প্রকাশ হইয়া, তিনি যে প্রস্তরেও আছেন তাহা সাধক অনুভব করিয়া থাকে। বস্তুতঃ নারায়ণ শিলা অল্পবুদ্ধি জীবের অবলম্বন মাত্র, ইহাই একটি প্রকৃত রূপের প্রতিমা, প্রতিমা শব্দের অর্থ—সাদৃশ, নারায়ণের রূপের সাদৃশই, শিলামূর্তি, নারায়ণের ধ্যান যাহা শাস্ত্রে লিখিত আছে, তাহার কতকটা অনুরূপ থাকায় অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন জীবের অবলম্বন করিয়া দেওয়া হইয়াছে। নারায়ণের ধ্যান যথা— ধ্যেয়ঃ সদা সবিতৃ-মণ্ডলমধ্যবর্তী নারায়ণঃ ইত্যাদি নারায়ণের ধ্যানের অর্থ করিয়া দেখিতে গেলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, নারায়ণ শিলার সহিত মিল নাই, ইহাতে আমার মনে স্বতঃই সন্দেহ হইতে পারে যে, নারায়ণের ধ্যানের সহিত যখন শিলা-মূর্তির মিল নাই; তখন তাহাকে নারায়ণ বলিতে পারি না। বস্তুতঃ আমার এ সন্দেহ হওয়াটা অন্যায় নহে। প্রকৃতভাব জানা না থাকিলে সন্দেহ আসাই সম্ভব। প্রকৃত ভাব আমাকে কেহই বুঝাইয়া দেন নাই, আমার সন্দেহ দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে, আমার হঠাৎ সন্দেহ করা চাহি না কারণ আমার যখন কোন বিষয়েরই প্রত্যক্ষ জ্ঞান নাই এবং কোথাও প্রত্যক্ষ বিষয়ও পাই নাই, তখন আমার যাহা আছে, তাহা কেন সন্দেহ করিয়া নষ্ট করি।

যাঁহারা পৌত্তলিক ধর্মকে ঘৃণা করিয়া একেশ্বর বাদকে মান্য করেন তাঁহারাও যে পৌত্তলিক, তাহা তাঁহারা জানিয়াও জানে না, একেশ্বর বাদীদিগেরও ঈশ্বরের হস্তপদাদির সহিত সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আছে এই কল্পনা করিয়া তাহাকে এক কল্পনার ক্ষেত্র স্বর্গধাম রচনা করিয়া তথায় তাঁহার রাজ্য আছে এবং সেই স্বর্গ-রাজ্যের অধীশ্বর সেই ঈশ্বর এই কল্পনা করিয়া তাঁহার উদ্দেশ্যে পুষ্প ইত্যাদি দিয়া প্রার্থনা করিয়া থাকেন। ইহার সত্যতা সম্বন্ধেও কাহারও প্রত্যক্ষ জ্ঞান আছে বলিয়া আমার বোধহয় না।

এমত অবস্থায় আর আমার দেবমূর্ত্তির কি অপরাধ হইল। এবং আমরা যে ভাবে দেবমূর্তির ধ্যান পূজা যে সব মন্ত্রের দ্বারা করিয়া থাকি, তাহাতে প্রতিমাই যে ঈশ্বর, তাহাও বলা হয় না, কার্য্যের দ্বারায় প্রতিমাতে ঐশ্বরিক দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্যই পূজা করিয়া থাকি, সুতরাং উপরোক্ত একেশ্বর বাদ অপেক্ষায় আমার সাকার বাদ ঘৃণার কথা নহে। সুতরাং আমার পূজাদিতে ঘৃণা বা সন্দেহ না করিয়া তাহার অনুষ্ঠান করা কর্তব্য। তবে আমার ধর্মে যাহা আছে তাহার প্রকৃত মর্ম অবগত হইবার চেষ্টা করা আমার অবশ্য কর্তব্য। এক্ষণে নারায়ণের ধ্যানের অর্থটাই দেখি, তাহাতে কি আছে আর নারায়ণ শিলার সহিত প্রকৃত রূপের সাদৃশ্যই বা কি তাহা আমার আগে জানা আবশ্যক হইয়া পড়িল দেখিতেছি।

ধোয়ঃ সদা সবিতৃমণ্ডলমধবর্তী নারায়ণঃ ইত্যাদি—অর্থাৎ সবিতৃ মণ্ডলের মধ্যবর্তী, (সূর্যমণ্ডলের মধ্যবর্তী) অবস্থাই নারায়ণ, তাহাকে সদা—নিয়ত ধ্যান কর, অর্থাৎ সূর্যামগুলের মধ্যবর্তী অবস্থাই নারায়ণ, তাঁহাকে জান, ইত্যাদি।

এক্ষণে সূর্য-মণ্ডলের মধ্যবর্তী অবস্থা কি তাহাও আমার জানা নাই। সূৰ্য্যমণ্ডল যাহা দেখিয়াছি, তাহা সমস্তই জ্যোতিঃতে পূর্ণ দেখিয়াছি, সূর্যমণ্ডলের মধ্যভাগেও জ্যোতিঃই দেখিতে পাইয়া থাকি, জ্যোতিঃ ব্যতীত আর কিছুই দেখিতে পাইতেছি না বলিয়া যে সূর্য্যমণ্ডলের মধ্যে অপর কিছুই নাই তাহা বলিতে পারি না, এবং বলাও উচিত নহে। সূর্যমণ্ডলের মধ্যবর্তী অবস্থা গাঢ় নীলবর্ণের (দেখিতে কৃষ্ণ বর্ণের ন্যায় দেখা যায় বস্তুতঃ কৃষ্ণবর্ণ নহে) গোলক এবং গোলক-মধ্যে গহ্বর, ইহাই সূর্য্যমণ্ডলের মধ্যবর্তী অবস্থা, ইহা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখাও যাইতে পারে, সূর্য্যকে নীলবর্ণের নক্ষত্রও বলা যাইতে পারে। স্বল্পবুদ্ধি মানবের জন্য অনুকরণে যতটা সম্ভব হয় ততটা অনুকরণ করিয়া রাখা হইয়াছে, ইহা করিবার উদ্দেশ্য যাঁহারা বহিরঙ্গ সাধনে রহিয়াছেন তাঁহাদের অবলম্বন জন্য ইহা মনঃস্থিরের উপায় মাত্র। নারায়ণ শিলাও গোলকার এবং শিলার মধ্যে গহ্বর আছে, শিলাতে কেবল নারায়ণ শিলার চতুর্দিকের জ্যোতির্ম্মণ্ডলের অভাব দেখিতে পাওয়া যায়, এই জ্যোতির্ম্মণ্ডলের অভাব দূর করিবার অভিপ্রায়ে নারায়ণ শিলার চতুর্দিকে যজ্ঞোপবীতের ছলে জ্যোতির্ম্মণ্ডলের উদ্দেশ্যে স্বর্ণের বা রৌপ্যের বা তান্ত্রের পাতের বলয়া-কৃতি নারায়ণের যজ্ঞোপবীত বলিয়া ব্যবহার করা হইয়া থাকে, বস্তুতঃ ইহা যজ্ঞোপবীত নহে, ইহা জ্যোতিঃর অনুরূপ মাত্র। যিনি সর্বব্যাপী অনন্ত, তাঁহার যজ্ঞোপবীত ধারণ করিবার স্থান কোথায়? (যজ্ঞোপবীত সম্বন্ধে পরে আলোচনা হইবে।)

নারায়ণ শিলাই স্বল্পবুদ্ধি বিশিষ্ট বহিরঙ্গ সাধকের একমাত্র অবলম্বন, ইহাতে মনঃস্থিরের ও কতকটা সাহায্য হইয়া থাকে, তবে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সহিত অনুষ্ঠান করা উচিত, তবে যদি কেবল সাধারণ শিলা বোধ থাকে, তাহা হইলে কিছুই হইবার আশা নাই, এ কারণ নারায়ণ শিলাকে পাথর বোধ না করিয়া, নারায়ণের সৌসাদৃশ্য বোধে তাঁহার সেবা করা উচিত, কারণ ইহা প্রথম অভ্যাসের প্রথম সোপান মাত্র। যেমত বাল্যকালে বালিকারা মৃত্তিকার বা কাষ্ঠের নির্ম্মিত পুত্তলিকা লইয়া নিজ সন্তান বোধে খেলা করিয়া থাকে, তাহার পর বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া পতিগৃহে যাইয়া পুত্রকন্যা হইলে তাহারা যেমত আর সাধারণ পুতুল খেলা না খেলিয়া পতি পুত্ৰ লইয়া আনন্দলাভ করে, তদ্রুপ সাধক যতকাল না অন্তরঙ্গ সাধন কার্য্য পান, ততদিন তাঁহাকে বহিঃরঙ্গ সাধনেই থাকিয়া বহিঃরঙ্গ সাধনের সহিত অন্তরঙ্গ সাধনের চেষ্টা করিতে হইবে ও করাও উচিত। তাহার পর অন্তরঙ্গ সাধনপ্রাপ্ত হইলে তখন তিনি আপন শরীরে নারায়ণ—রূপ দর্শন করিয়া তৃপ্তিলাভ করিবেন, এবং নারায়ণের ধ্যান যাহা লিখিত আছে তাহা যে ভুল নহে তাহাও হৃদয়মঙ্গল করিতে পারিবেন। এক্ষণে অন্তরঙ্গ সাধনের নারায়ণই বা কিরূপ তাহাই আমার এখন জানিবার বিষয় বলিয়া বোধ হইতেছে।

পূর্বে বলা হইয়াছে শরীররূপ জগৎ ও বর্হিজ্জগৎ তুল্য, শরীররূপ জগতের যেমন প্রাণের ক্রিয়ার দ্বারায় অস্তিত্ব রহিয়াছে বহির্জগতেরও তদ্রূপ প্রাণের ক্রিয়া (শ্বাস প্রশ্বাস) দ্বারায় অস্তিত্ব রহিয়াছে, এবং কালে শরীরও যেমন প্রাণের ক্ষয় ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে বহিৰ্জ্জগৎও তদ্রূপ প্রাণের ক্রিয়া রহিত হইলে কালে ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে।

জীব-দেহের প্রাণের ক্রিয়াই শ্বাস-প্রশ্বাস, শরীররূপ জগতের উৎপত্তি, স্থায়িত্ব এবং ধ্বংস প্রাণের ক্রিয়া শ্বাস-প্রশ্বাস দ্বারা হইতেছে। বহির্জগতের প্রাণের ক্রিয়া রূপ শ্বাস- প্রশ্বাস দ্বারা উৎপত্তি, স্থায়িত্ব এবং ধ্বংস হইয়া থাকে। বহির্জগতের প্রাণের ক্রিয়ারূপ শ্বাস-প্রশ্বাসই জোয়ার ও ভাটা। এই জোয়ার ভাটারূপ শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া দ্বারা বহির্জগৎও একদিন ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে।

বহির্জগৎও নারায়ণের একটি বিরাট দেহ মাত্র; মানব শরীরও ক্ষুদ্র একটি মায়িক ব্রহ্মাণ্ড বিশেষ। মানব দেহে সবই প্রত্যক্ষভাবে অনুস্বরূপে বর্ত্তমান। মানব মাত্রেই নিজ নিজ দেহতত্ত্বকেও দেহস্থিত আত্মা নারায়ণকে যতক্ষণ বা যতকাল না জানিবে ততকাল তাহার কিছুই জানা হয় নাই বলিয়া বিবেচনা করা উচিত। মানব দেহই আত্মানারায়ণের মন্দির স্বরূপ। দেহ মন্দিরস্থিত আত্মানারায়ণকে অন্তরঙ্গ সাধন দ্বারা যাঁহারা ভাগ্যবান সাধক তাঁহারা প্রত্যক্ষ করিয়া থাকনে, এবং যিনি উপদেষ্টা গুরু তিনি প্রথমে আত্মানারায়ণের রূপ দেহ মধ্যস্থিত গোলকধামে দেখাইয়া দেন বলিয়া গুরু সকলের প্রণম্য। গোলক ধাম মানব দেহেই বৰ্ত্তমান অর্থাৎ দেহের মধ্যে যে স্থানে জ্যোতিঃর বা সবিতৃ-মণ্ডলের মধ্যে গাঢ় নীলবর্ণের গোলক (মণ্ডলাকার পদার্থ) প্রকাশমান, সেই স্থানকেই গোলকধাম বলা যায়। গুরু উহা দর্শন করাইয়া দেন বালিয়াই তিনি সকলের প্রণম্য। “অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্। তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ”! গুরুর এই প্রণাম মন্ত্রেই বুঝা যাইতেছে যে গুরুর কার্য্য “মুখে বলিয়া দেওয়া নহে” তিনি প্রত্যক্ষ দর্শন করিয়াই দিয়া থাকেন। তাহার পর সাধক সাধন দ্বারা তাহাতেই নিজের মনের লয় সাধন করিয়া থাকেন। ইহাই প্রথম সোপান এবং গুরু যাহা দেখাইয়া দেন তাহাই অন্তরঙ্গ সাধনের অন্তরস্থিত আত্মানারায়ণের রূপ। উক্ত আত্মানারায়ণের রাস, দোল ইত্যাদি উৎসব যাহা আমরা বাহিরে দেখিয়া থাকি তাহার বিষয় ক্রমে ক্রমে বিবেচনা করা যাইবে। এখানে রাসযাত্রা কি তাহাই দেখা যাউক।



সূত্র: ( জগৎ ও আমি - পঞ্চানন ভট্টাচার্য/ তৃতীয় পরিচ্ছেদ)

মন্তব্যসমূহ