নিজস্ব প্রতিবেদক : ॐ তত্ত্বদর্শী~TatwaDarshi~तत्त्वदर्शी ॐ
বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিকেই অক্ষয় তৃতীয়া বলা হয় । হিন্দু শাস্ত্রানুসারে অক্ষয় তৃতীয়া অনন্য তাৎপর্যময় এবং পরম মাহাত্ম্যপূর্ণ তিথি। অক্ষয় শব্দের অর্থ হলো যার ক্ষয় নেই ; তাই এই মহাপবিত্র তিথিতে কোন শুভকার্য সম্পাদন করলে তা অনন্তকাল অক্ষয় হয়ে থাকে।বিষ্ণুপুরাণে বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া বা অক্ষয় তৃতীয়াকে 'যুগাদ্যা' নামে অভিহিত করা হয়েছে। যুগাদ্যা হল যুগের প্রথম দিন। অক্ষয় তৃতীয়া হল সত্য যুগের যুগাদ্যা। অর্থাৎ সত্যযুগের প্রথম দিন। যুগাদ্যা তিথি এবং এর মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে শ্রীসনৎকুমার বলেন:
বৈশাখমাসস্য চ যা তৃতীয়া
নবম্যসৌ কার্তিকশুক্লপক্ষে।
নভস্য মাসস্য চ কৃষ্ণপক্ষে
ত্রয়োদশী পঞ্চদশী চ মাঘে৷৷
এতা যুগাদ্যাঃ কথিতাঃ পুরাণে-
ষ্বনন্তপুণ্যাস্তিথয়শ্চতস্রঃ।
উপপ্লবে চন্দ্রমসো রবেশ্চ
ত্রিষ্বষ্টকাস্বপ্যয়নদ্বয়ে চ৷৷
পানীয়মপ্যত্র তিলৈর্বিমিশ্রং
দদ্যাৎ পিতৃভ্যঃ প্রযতো মনুষ্যঃ।
শ্ৰাদ্ধং কৃতং তেন সমাসহস্ৰং
রহস্যমেতৎ পিতরো বদন্তি৷৷
(বিষ্ণুপুরাণ: ৩.১৪.১২-১৪)
"বৈশাখমাসের শুক্লা তৃতীয়া, কার্তিকের শুক্লা নবমী, ভাদ্রপদের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী এবং মাঘ মাসের অমাবস্যা— এ চার তিথিকে পুরাণে ‘যুগাদ্যা’ নামে অভিহিত করা হয়। এই চারতিথি অনন্ত পুণ্যদায়িনী। চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের সময়, তিন অষ্টকাতে অথবা উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের আরম্ভে যে ব্যক্তি একাগ্র চিত্তে পিতৃ-পুরুষকে তিলসহ শুধুমাত্র জলও দান করেন, তাঁর একসহস্র বর্ষের শ্রাদ্ধকর্মের ফল লাভ হয়। সকলের অবিদিত এই পরম রহস্যময় দিবসসমূহের মাহাত্ম্যকথা স্বয়ং পিতৃগণই বলেন।"
অক্ষয় তৃতীয়া সম্পর্কে শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক স্মার্তচূড়ামণি শ্রীরঘুনন্দন ভট্টাচার্য প্রণীত "তিথিতত্ত্বম্" গ্রন্থে যা বলা আছে তাই সংক্ষেপে সংস্কৃত শ্লোক থেকে বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তুলে ধরছি। স্মৃতিতে বলা আছে - বৈশাখ মাসের শুক্লতৃতীয়া যদি কৃত্তিকা বা রোহিণীনক্ষত্র যুক্ত হয়, তবে তাকে অক্ষয় তৃতীয়া বলে। এ দিনে দান সহ যে যে পবিত্র কর্ম করা হয় তার সকল ফলই অক্ষয় হয়।
ভবিষ্যোত্তর পুরাণে বলা আছে - বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের যে তৃতীয়া তিথি, তা জগতে অক্ষয় নামে প্রসিদ্ধ, তাই দেবগণেরও প্রিয় এ তিথি। যে মনুষ্য এ দিনে জল ও অন্ন-সম্মিলিত কুম্ভ দান করে সে জ্যোতির্ময় সূর্যলোক প্রাপ্ত হয়।ব্রহ্মপুরাণে বলা আছে - বৈশাখমাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়াতে যে ব্যক্তি চন্দনচর্চিত ভগবান শ্রীহরি বিগ্রহ দর্শন করে, সে ভগবানের পরমধামে গমন করে।আরও বলা আছে - শ্রীভগবান বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়াতে সত্যযুগের অবতারণা করেন এবং খাদ্যশস্য হিসেবে যবের উৎপত্তি করেন। তাই এ দিনে যব দ্বারা ভগবানের পূজা করবে এবং ব্রাহ্মণ সহ সকলকে যব দান করবে এবং ভোজন করাবে। এদিনে পতিতপাবনী গঙ্গাও পৃথিবীতে অবতরণ করে। তাই এ দিনে মহাদেব, গঙ্গা,কৈলাস ও হিমালয় পর্বতাদির পূজা করবে এবং সাথে সাথে সগরকুলের ধুরন্ধর ভগীরথ রাজারও পূজা করবে। এ দিনে স্নান,দান, তপ,শ্রাদ্ধ এবং হোম ইত্যাদি যে যে মঙ্গলময় অনুষ্ঠান করবে, তা সকলই অক্ষয় ফল দান করবে।অক্ষয় তৃতীয়াতে ভগবানের বিগ্রহাদির শরীরে শোভন ও সুগন্ধ লেপনদ্রব্য চন্দন প্রভৃতি লিপ্ত করা হয়। স্কন্ধপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডে বৈশাখমাস মাহাত্ম্য নামক অংশের বিভিন্ন স্থানেই শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথির মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে।
শ্রুতদেব উবাচ।
অথাতঃ সম্প্ৰবক্ষ্যামি মাহাত্ম্যং পাপনাশনম্ । অক্ষয্যায়াতৃতীয়ায়াঃ সিতে পক্ষে চ মাধবে ॥
যে কুর্বন্তি চ তস্যাং বৈ প্রাতঃ স্নান: ভগোদয়ে।
তে সর্বে পাপনির্মুক্তা যান্তি বিষ্ণোঃ পরং পদম্ ॥
দেবান্ পিতৃন্মুনীন্ যস্ত কুর্য্যাদুদ্দিস্য তৰ্পণম্।
তেনাধীতঞ্চ তেনেষ্টং তেন শ্রাদ্ধশতং কৃতম্ ॥
মধুসূদনমভার্চ্চ্য কথাং শৃণ্বন্তি যে নরাঃ।
অক্ষয্যায়াং তৃতীয়ায়ান্তে নরা মুক্তি ভাগিনঃ ॥
যে দানং তত্র কুর্বন্তি মধুদ্বিট্ প্রীতয়ে শুভম্।
তদক্ষয্যং ফলত্যের মধুশাসনশাসনাৎ ॥
দেবর্ষিপিতৃদৈবত্যা তিথিরেষা মহাশুভা।
ত্রয়াণাং তৃপ্তিদাত্রী চ কৃতে ধর্মে সনাতনে ॥
(স্কন্দ পুরাণ: বিষ্ণুখণ্ড, বৈশাখমাস মাহাত্ম্য, ২৩.১-৬)
"শ্ৰুতদেব বললেন,— অনন্তর বৈশাখমাসের শুক্লপক্ষীয় অক্ষয়তৃতীয়ার পাপনাশন মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি। যারা অক্ষয় তৃতীয়ার সূৰ্য্যোদয়ে প্রাতঃস্নান করে, তারা পাপ মুক্ত হয়ে বিষ্ণুর পরমপদ প্রাপ্ত হয়। যে মানব এই পুণ্যতিথিতে দেব, পিতৃ ও মুনিগণের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে, তার সমস্ত অধ্যয়ন, সমস্ত যজ্ঞ ও শত শ্রাদ্ধ করার পুণ্য লাভ হয়। যে সকল লোক অক্ষয় তৃতীয়ায় মধুসূদনের পূজা করে এবং তাঁর পুণ্যকথা শ্রবণ করে, সেই পুণ্যবান ব্যক্তিরা মুক্তি লাভ করে । যে নর এই তিথিতে ভগবানের প্রীতির জন্য মনোজ্ঞ দান করে, মধুশাসনের শাসনে তার সেই দান অক্ষয়ফল দান করে। শুভদায়িনী এ পুণ্যতিথিতে দেবতা, ঋষি, এবং পিতৃগণকে উদ্দেশ্য করে ধৰ্মকৰ্ম করলে সেই সকল কর্মই অক্ষয় হয়। অক্ষয় তৃতীয়া দেব, ঋষি ও পিতৃগণ এই ত্রিলোকেরই তৃপ্তিদান করে থাকে।"
রঘুনন্দনের বলা ছাড়াও আরো অসংখ্য মাহাত্ম্যপূর্ণ এবং তাৎপর্যময় ঘটনার তিথি পবিত্র এ অক্ষয় তৃতীয়া।
ভগবানশ্রীপরশুরাম অবতাররূপে আসেন এ দিনেই।
শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়নবেদব্যাস এ দিনেই মহাভারতের রচনা শুরু করেন।দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী ধুমাবতীর আবির্ভাব এ দিনেই। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় চারধামের অন্যতম কেদার বদরীনাথের মন্দির ছয়মাস বন্ধ থেকে এ দিনেই তার দ্বার খুলে দেয়া হয়। দ্বার খুললেই অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ দৈব অক্ষয়দীপের দর্শন হয় সকলের।কুবেরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান মহাদেব তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেন এদিনেই। কুবেরের লক্ষ্মী এবং অতুল ঐশ্বর্য লাভ হয়েছিলো বলে এদিনে তাই বৈভব-লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।পুরীধামে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষে রথ নির্মাণ এ দিন থেকেই শুরু হয়ে জগন্নাথদেবের ২১ দিনব্যাপী চন্দনযাত্রা উৎসবের সূচনা ঘটে।সকল দেবস্থানে বিশেষ করে বৈষ্ণবদেবস্থানে এ দিন থেকেই মহাধুমধামে চন্দনযাত্রা উদযাপিত হয়। বঙ্গের সাধকপুরুষ রামচন্দ্রদেবের এ দিনে তিরোধান দিবস। তাই এ দিনে সারাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ নোয়াখালীর চৌমুহনীতে স্থিত তাঁর সমাধিবেদিতে জল দান করেন।
তাই এদিনে আমরা যদি ভালো কাজ করি, তবে আমাদের অক্ষয় পূণ্য লাভ হবে পক্ষান্তরে তামসিক খারাপ কাজের ফল হবে অক্ষয় পাপের যমযন্ত্রণা । তাই এদিন খুব সাবধানে প্রতিটি কাজ করা উচিত। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এ দিন ভুলেও যেন কোনো পাপকাজ আমাদের দ্বারা না হয়ে যায়। ভুলেও যেন মন্দ-কটু কথা না বেরোয় আমাদের মুখ থেকে। তাই এদিন যথাসম্ভব সাত্ত্বিকভাব থাকা প্রয়োজন। আর এদিন পূজা,জপ,ধ্যান,দান,অপরের মনে আনন্দ দেয়ার মত কাজ করা উচিত। দিনটি ভালোভাবে কাটানোর অর্থ সাধনজগতের পথে অনেকটা এগিয়ে ঈশ্বরের নৈকট্যলাভ।
কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,
সংস্কৃত বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সংগৃহীত: কুশল বরণ চক্রবর্তী পেজ হতে।

মন্তব্যসমূহ