নিজস্ব প্রতিবেদক : ॐ তত্ত্বদর্শী~TatwaDarshi~तत्त्वदर्शी ॐ
কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
আদ্যাশক্তি কালীই কামাখ্যা
দেবীর সকল বিদ্যার যিনি সুসাধক, তিনিও মহামায়ার এই কামাখ্যা রূপ এবং মন্ত্রের আরাধনা করবেন। দেবী কামাখ্যার মন্ত্রের সাধন না করলে পদে পদে সাধকের বিঘ্ন উপস্থিত হয়। তাই শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, সৌর গাণপত্যসহ পঞ্চমতের সকলকেই মহামায়া কামাখ্যার আরাধনা করতে হয়। দেবী মহামায়াই তাঁর অচিন্ত্য মায়াশক্তি দ্বারা সবাইকে মুগ্ধ করে আছেন।
কামাখ্যাসাধনং কাৰ্য্যং সৰ্ববিদ্যাসু সাধকৈঃ।
অন্যথা সিদ্ধিহানিঃ স্যাৎ বিঘ্নস্তস্য পদে পদে ॥
কিং শাক্তা বৈষ্ণবা কিংবা কিং শৈবা গাণপত্যকাঃ। মহামায়াবৃতাঃ সর্বে তৈলযন্ত্রে বৃষা ইব ৷৷
(কামাখ্যাতন্ত্র: দ্বিতীয় পটল,১২-১৩)
"অন্য সমস্ত বিদ্যার যিনি সুসাধক তিনিও এই কামাখ্যা মন্ত্রের সর্বদা সাধন করবেন। এই মন্ত্র সাধন না করলে পদে পদে সাধকের বিঘ্ন উপস্থিত হয়।
শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, গাণপত্যসহ সকলেই তৈলযন্ত্রে বৃষের মত আবদ্ধ হয়ে মহামায়া দ্বারা আবদ্ধ হয়ে আসেন।"
দেবী কামাখ্যার স্বরূপ সম্পর্কে কামাখ্যাতন্ত্রে বলা হয়েছে, তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, চন্দ্রসহ সকল দেবগণের সেবিতা। সমস্ত দেবতাগণের দেবত্বরূপী মূলশক্তিই কামরূপিণী কামাখ্যা। আদ্যাশক্তি মহামায়ার মহাবিদ্যারূপিণী যে সকল রূপ সাধকের ইষ্টদেবতা রূপে বিদ্যমান তাঁ সকলেই দেবী কামাখ্যার রূপভেদমাত্র। দেবী কামাখ্যাই আদ্যাশক্তি কালী। তিনিই সকল জীবের কারণ। জগতে স্থাবর-অস্থাবর চরাচর সমস্ত এবং নিত্য-অনিত্য যা কিছুই বিদ্যমান আছে তা সকল কিছুরই উৎস তিনি। তাই ত্রিভূবনে কামাখ্যারূপিণী মহামায়া কালী ভিন্ন আর দ্বিতীয় কোন সত্ত্বার অস্তিত্ব নেই।
বরদানন্দদা নিত্যা মহাবিভববৰ্দ্ধিনী ।
সর্বেষাং জননী সাপি সর্বেষাং তারিণী মতা ॥
রমণী চৈব সর্বেষাং স্থূলা সূক্ষ্মা শুভা সদা।
তস্যাস্তন্ত্রং প্রবক্ষ্যামি সাবধানাবধারয় ॥
নিখিলাসু চ বিদ্যাসু যে যে সিধ্যন্তি সাধকাঃ।
যত্র কুত্রাপি কেনাপি কামাখ্যা বরদায়িনী ॥
কামাখ্যা সিদ্ধিদা তেষাং সৰ্ববিদ্যাস্বরূপিণী। কামাখ্যাবিমুখা লোকা নিন্দিতা ভুবনত্রয়ে ॥
বিনা কামাত্মিকাং কাপি ন দাত্ৰী সিদ্ধিসম্পদাম্ । কামাখ্যেব সদা ধৰ্মঃ কামাখ্যা চার্থ এব চ ॥
কামাখ্যা কামসম্পত্তিঃ কামাখ্যা মোক্ষ এব চ।
নির্বাণং সৈব দেবেশি সৈব সাযুজ্যমীরিতম্ ॥
সালোক্যং সহরূপঞ্চ কামাখ্যা পরমা গতিঃ ।
সেবিতা ব্ৰহ্মাদ্যৈ দেবি বিষ্ণুণা চন্দ্ৰেণাপি চ ॥
দেবত্বং সর্বদেবানাং নিশ্চিতং কামরূপিণী।
সর্বাসামপি বিদ্যানাং লৌকিকং বাক্যমেব চ ॥ কামাখ্যায়া মহাদেব্যাঃ স্বরূপং সর্বমেব হি।
পশ্য পশ্য প্রিয়ে সর্বং চিন্তয়িত্বা হৃদি স্বয়ম্ ॥
কামাখ্যাঞ্চ বিনা কিঞ্চিন্নাস্তি তু ভুবনত্রয়ে। লক্ষকোটিমহাবিদ্যাস্তস্ত্রাদৌ পরিকীর্তিতাঃ ॥
সারাৎ সারতমা দেবি সর্বাসাং ষোড়শী মতা।
তস্যাপি কারণং দেবি কালিকা জগদম্বিকা ॥ চন্দ্রকান্তিৰ্যথা দেবি জায়তে লীয়তে পুনঃ।
স্থাবরাণি চরাণি চ নিত্যানিত্যানি যানি চ ॥
সত্যং সত্যং পুনঃ সত্যং বিনা তাং নৈব জায়তে।।
(কামাখ্যাতন্ত্র: প্রথম পটল, ৫-১৭)
" দেবী কামাখ্যা নিত্যা, বর ও আনন্দদায়িনী এবং তিনি সাধকের মহাবিভববৰ্দ্ধিনী। তিনি সকল জীবের জননীরূপা এবং সকলের ত্রাণকারিণী।
তিনি সর্বদা স্থূল এবং সূক্ষ্ম সমস্তের মূলীভূত শক্তিস্বরূপা এবং তিনি জীবের শুভদায়িনী । আমি সেই মহাবিদ্যা মহাকায়া কামাখ্যার তন্ত্র বলছি, একাগ্রতার সাথে শ্রবণ কর।
সমগ্র বিশ্বে যত প্রকার বিদ্যার সাধনা দ্বারা সাধক যত বিভিন্ন প্রকার সিদ্ধিলাভ করে, এর মধ্যে দেবী কামাখ্যা স্বরূপই অত্যন্ত বরদায়িনী বা ফলপ্রদাত্রী ।
কামাখ্যা সাধকদেরর পক্ষে সৰ্ববিদ্যাস্বরূপিণী এবং সিদ্ধিদায়িনী। যে মানব কামাখ্যার প্রতি বিমুখ সে ত্রিভূবনে নিন্দিত হয়। অর্থাৎ তার কোন গতি হয় না।
একমাত্র কামাত্মিকা মহামায়া কামাখ্যা ভিন্ন অন্য কেউ জীবের সিদ্ধিরূপ সম্পদ প্রদানের অধিকারী নন। কামাখ্যা সর্বদা ধর্ম এবং অর্থরূপিণী।
দেবী কামাখ্যা কাম এবং মোক্ষরূপীদায়িনী । কামাখ্যাই
সাধকের নির্বাণ এবং কামাখ্যাই সাধকের ইষ্টের সাথে সাযুজ্যরূপ মুক্তি।
দেবী কামাখ্যাই জীবের সালোক্য, সারূপ্য রূপ মুক্তিসহ পরমা গতি। হে দেবী ! ব্রহ্মত্ব, বিষ্ণুত্ব, শিবত্ব, চন্দ্রত্ব বা সমস্ত দেবতাগণের যে দেবত্বশক্তি, তা সকলই কামরূপিণী কামাখ্যার । সমস্ত বিদ্যাসমূহের যা কিছু লৌকিক বাক্য তাও কামাখ্যার।
মহাবিদ্যারূপিণী যে সকল মহাদেবী বিদ্যমান তাঁরা সকলেই দেবী কামাখ্যার রূপভেদমাত্র। হে প্রিয়ে ! স্বীয় হৃদয়ে ধ্যান করে এতৎসমুদয় দর্শন কর।
ত্রিভূবনে কামাখ্যা ভিন্ন দ্বিতীয় অন্য কোন সত্ত্বার অস্তিত্ব নেই। তন্ত্রসমূহে লক্ষ,কোটি মহাবিদ্যার বিষয় পরিকীৰ্ত্তিত হয়েছে ।
ষোড়শী সমস্ত বিদ্যাসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর হইতেও শ্রেষ্ঠতম। হে দেবি! জগদম্বিকা কালিকাই এর মূল কারণ।
হে দেবি! চন্দ্রের কাস্তি যেরূপ একবার লুপ্ত হয়ে পুনরায় উৎপন্ন হয়, তেমনি স্থাবর-অস্থাবর চরাচর সমস্ত এবং নিত্য-অনিত্য যা কিছুই বিদ্যমান আছে তা সকল কিছুরই উৎস দেবী কামাখ্যা। দেবী কামাখ্যা ভিন্ন কিছুই উৎপন্ন হয় না। এটা সত্য, অতীব সত্য এবং ধ্রুব সত্য।"
কালিকাপুরাণের ৬২ তম অধ্যায়ে দেবী কামাখ্যার মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। সেই অধ্যায়ের শুরুতেই ভগবান শিব আদ্যাশক্তি দেবী কামাখ্যার স্বরূপ বর্ণনা করেন।তিনি বলেন, দেবী কামাখ্যাই প্রকৃতিরূপে সমুদয় জগতকে সৃষ্টিতে নিয়োজিত করে । সৃষ্টির সাথে সম্পর্কের কারণেই দেবী সৃষ্টির প্রতীকে যোনিচিহ্নে পূজিতা।
কামার্থমাগতা যস্মান্ময়া সার্দ্ধং মহাগিরৌ ।
কামাখ্যা প্রোচ্যতে দেবী নীলকূটে রহোগতা ।।
কামদা কামিনী কামা কান্তা কামাঙ্গদায়িনী ।
কামাঙ্গনাশিনী যস্মাৎ কামাখ্যা তেন চোচ্যতে ।।
এতস্যাঃ শৃণু মাহাত্ম্যং কামাখ্যায়া বিশেষতঃ ।
যা সা প্রকৃতিরূপেণ জগৎ সর্বং নিযোজয়েৎ ।।
মধুকৈটভনাশায় মহামায়াবিমোহিতঃ ।
যদা সংযুযুধে বিষ্ণুস্তদৈষা মোহয়দ্দৃঢ়ম ।।
( কালিকাপুরাণ:৬২,১-৪ )
"ভগবান শিব বললেন, যেহেতু দেবী আমার সাথে আনন্দলীলা অনুভবের হেতু নীলপর্বতে এসেছিলেন, তাই এই নির্জন পর্বত প্রদেশে দেবী ‘কামাখ্যা’ নামে খ্যাতা হয়েছেন।
ইনি কামিনী, কামদা, কামা, কান্তা এবং কামাদি দায়িনী ; দেবী যেহেতু কামাঙ্গনাশিনী তাই তিনি কামাখ্যা নামে খ্যাত হয়েছেন।
এই কামাখ্যা দেবীর বিশেষ মাহাত্ম্য শ্রবণ কর- এ কামাখ্যা দেবীই প্রকৃতিরূপে সমুদয় জগতকে সৃষ্টিতে নিয়োজিত করছেন ।
মহামায়াবিমোহিত হয়ে ভগবান বিষ্ণু যখন মধু কৈটভের বধের নিমিত্ত যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন এই কামাখ্যাদেবীই তাদের মোহিত করেন।"
সৰ্ববিদ্যাস্বরূপিণী আদ্যাশক্তি মহামায়া কালীই জগতকে ধারণ করে আছেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জড় চেতন সকল কিছুরই উৎস তিনি। সেই তিনিই দেবী কামাখ্যা নামে ত্রিভুবনে খ্যাতা। অর্থাৎ যিনি আদ্যাশক্তি কালী, তিনিই কামাখ্য। দুই রূপদ্বয়ে কোন ভেদ নেই।এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তিনিই পরম সত্য, এবং অবিনশ্বর। জগতে তিনি ছাড়া আর কোন সত্য নেই। কৃষ্ণবর্ণা জগদ্ধাত্রী কালীর কথা আগমশাস্ত্রে অর্থাৎ বেদেও যেমন বর্ণিত হয়েছে, তেমনি পুরাণাদি তন্ত্রশাস্ত্রেও তাঁর মাহাত্ম্যকথা বর্ণিত। অখিল তন্ত্রশাস্ত্রের সিদ্ধান্ত তিনি। অপরিমেয় শক্তি এবং করুণার সাগর তিনি। তিনিই জীবের মুক্তিময়ী আনন্দরূপিণী।
যা দেবী কালিকামাতা সৰ্ববিদ্যাস্বরূপিণী।
কামাখ্যা সৈব বিখ্যাতা সত্যং দেবি ন চান্যথা।।
কামাখ্যা সৈব বিখ্যাতা সত্যং দেবি ন সংশয়ঃ।
সৈব ব্রহ্মেতি জানীহি যজ্ঞার্থং দর্শনানি চ ॥
বিচরন্তি চোৎসুকানি যথা চন্দ্রে হি বামনঃ ।
তস্যাং হি জায়তে সর্বং জগদেতচ্চরাচরম্ ॥
লীয়তে পুনরস্যাঞ্চ সন্দেহং মা কুরু প্রিয়ে।
স্থূলা সূক্ষ্মা পরা দেবী সচ্চিদানন্দরূপিণী ॥
অমেয়া বিক্রমাখ্যা সা করুণাসাগরা মাতা।
মুক্তিময়ী জগদ্ধাত্রী সদানন্দময়ী সদা॥
বিশ্বম্ভরী ক্রিয়াশক্তিস্ততঃ সৈব সনাতনী ।
যথা কৰ্ম সমাপ্তৌ চ দক্ষিণা ফলসিদ্ধিদা ॥
তথা মুক্তিরসৌ দেবি সর্বেষাং ফলদায়িনী ।
অতো হি দক্ষিণা কালী কথ্যতে বরবর্ণিনী ॥
কৃষ্ণবর্ণা সদা কালী আগমেষু চ নির্ণয়ঃ ।
উক্তানি সৰ্বতন্ত্রাণি তথা নান্যেতি নির্ণয়ঃ ॥
(কামাখ্যাতন্ত্র: দশম পটল, ৪-১১)
"মা কালিকা সৰ্ববিদ্যাস্বরূপিণী। তিনিই দেবী কামাখ্যা নামে পরিচিতা হয়ে ত্রিভুবনে খ্যাতা। হে দেবী ! এটা পরম সত্য, এর ব্যতিক্রমী কোন সত্য নেই।
তিনিই ব্রহ্ম, তিনিই যজ্ঞপুরুষ এবং তিনিই প্রতিপাদ্য আদিসত্ত্বা। আদ্যাশক্তি কামাখ্যা হতেই চরাচর সমগ্র বিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে। হে প্রিয়ে ! পুনরায় সেই মহাশক্তিতেই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লয় প্রাপ্ত হবে। এ নিয়ে কোন সন্দেহ প্রকাশ করিও না। তিনিই স্থূল ও সূক্ষ্মরূপা পরাশক্তি এবং তিনিই সচ্চিদানন্দরূপিণী।
তিনিই অপরিমেয় শক্তির আধার এবং করুণার সাগর রূপা মাতা। তিনি মুক্তিময়ী জগদ্ধাত্রী এবং সর্বদা সদানন্দরূপিণী।
তিনিই বিশ্বম্ভরী ক্রিয়াশক্তি এবং তিনিই সনাতনী। যজ্ঞাদি কৰ্ম- সমাপ্তির পর দক্ষিণা প্রদান করলে যেমন ফল সিদ্ধিলাভ হয়, সেরূপ তিনিই সর্বকৰ্মফলদায়িনী এবং সকলের মুক্তিদায়িনী। হে বরবর্ণিনি! এইজন্যই তাঁকে দক্ষিণা কালী নামে অভিহিত করা হয়।
কৃষ্ণবর্ণা জগদ্ধাত্রী কালীর কথা বেদেও বর্ণিত। সমস্ত তন্ত্রশাস্ত্রেও তাঁর মাহাত্ম্য প্রকাশিত করা হয়েছে। তাঁর তত্ত্ব এবং মাহাত্ম্য ছাড়া তন্ত্রে আর কোন অন্য মত নেই।"

মন্তব্যসমূহ